গণ-অভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে; যার সব এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এমনকি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর ব্যাপারে আপত্তি রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু তারাও শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে রাজধানীতে গতানুগতিক একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ জারি করে রেখে গেছে।
এখন এই বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি কর্মক্ষম করে তুলতে হলে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন, যা নতুন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে আরেকটি বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার মতোই।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অনেকটাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে হচ্ছে। রাজধানীর সাত কলেজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে তাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। তবে যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের মান নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়টি শত চেষ্টা করেও র্যাংকিংয়ে খুব একটা এগোতে পারছে না।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে পৌঁছতেই দীর্ঘ সময় লাগবে।
সূত্র জানায়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারির পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার ও সদ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হওয়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীন। অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে তাঁদের দুজনের পছন্দমতো একজন ভিসিও নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস মো. আবদুল হাছিব।
কিন্তু তাঁর কোনো ধরনের প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকায় নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অনেকটাই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সদ্য বদলি হওয়া শিক্ষাসচিব এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অন্য একটি খাত থেকে চলতি অর্থবছরেই ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা দিয়ে আপাতত কার্যক্রম শুরু করতে চেয়েছিলেন। এরপর আগামী অর্থবছরে আরেকটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে আরো হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের একটি পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ায় এর কোনো কিছুই এখনো হয়নি। ফলে নতুন ভিসিও অনেকটা ভাসমান অবস্থায় আছেন।
অন্যদিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর সাত কলেজে গত শিক্ষাবর্ষে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে এখনো ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। ফলে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কার্যক্ষম না হলে এসব শিক্ষার্থীর পরিচয় নিয়েই জটিলতা সৃষ্টি হবে। রাজধানীর সাত কলেজের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড় করানো এত সহজ নয়। নতুন যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয় তাদের কোনো শিক্ষার্থী থাকে না। তারা একটি অবকাঠামো করে প্রতিবছর তিন-চার শ স্টুডেন্ট ভর্তি করে এগিয়ে যায়। কিন্তু ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি সম্পূর্ণই আলাদা। তারা কাজ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিদ্যমান এক লাখ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হবে। ফলে এই বিদ্যমান শিক্ষক-অবকাঠামো দিয়ে যখন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়াই কষ্টকর, সেখানে মানের দিকে তাকানো অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়াবে। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের জায়গায় পৌঁছাতেও দীর্ঘ সময় লাগবে, এটাই স্বাভাবিক।’
জানা যায়, রাজধানীর সাত কলেজ ঘিরে সংকট দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই শুধু দুজন উপাচার্যের ব্যক্তিগত স্বার্থের জেরে কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। সরকারি এসব কলেজ হলো—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ। এরপর দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটিলতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করা হয়। এরপর সরকার কলেজগুলো একীভূত করে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ নেয়, যার ফলেই একাধিকবার পরিমার্জনের পর আজকের এই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অদ্যাদেশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজের জন্য ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। কাগজপত্রে ভাষায় ভিন্নতা থাকলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম অনেকটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হবে। এখন ঢাকার সাতটি কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চারুকলা এবং বিধি দিয়ে নির্ধারিত অন্যান্য ‘স্কুল’ থাকবে। ‘স্কুল’ বলতে মূলত অনুষদেরই বিকল্প ব্যবস্থাকে বোঝানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আচার্য, উপাচার্য, সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিলসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো রাখা হয়েছে। অর্থাৎ অনুষদের বদলে স্কুল আর অধিভুক্তির বদলে সংযুক্তি দিয়ে নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা করা হয়েছে।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষদের অধীনে বিভাগ পরিচালিত হলেও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্কুল’ ব্যবস্থা চালু আছে; যেমন—স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্স, হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও ভিন্ন আকারে স্কুল আছে; যেমন—স্কুল অব আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ রয়েছে, যার প্রধান একজন ডিন। তবে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে স্কুলপ্রধানকে বলা হবে ‘হেড অব স্কুল’।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমের ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় (মূল ক্যাম্পাস) বা সংযুক্ত কলেজগুলোর স্কুল বা ডিসিপ্লিনে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে সংযুক্ত সাত কলেজের পাশাপাশি মূল ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। ফলে একসময় মূল ক্যাম্পাস শক্তিশালী হয়ে গেলে আবার এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা অবহেলার শিকার হতে পারেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে এমফিল, পিইচডি কোর্স চালু রয়েছে। আগে ভিন্ন কিছু বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু করা হলেও বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি।
ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার সূত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, রাজধানীর সাত কলেজের স্বতন্ত্রতা, স্বকীয়তা বজায় থাকুক। কলেজগুলোর পুরনো ঐতিহ্য আমরা ধরে রাখতে চাই। মেয়েদের কলেজগুলোর স্বতন্ত্রতা ধরে রাখতে চাই। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশে তা বজায় রাখা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে তারা মানের দিকে খুব বেশি নজর দিতে পারে না। আমরা চাইব, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব পালন না করে মান উন্নয়নে নজর দিক।’
সূত্র: কালের কন্ঠ

