রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র সংসদ (রাকসু) জেনারেল সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের স্বভাবসুলভ আচরণ ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী মহল ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
শিক্ষকরা বলছেন, তার শারীরিক ভাষা, চাল-চলন, কথাবার্তা এবং আচরণ সবই অসংযত। তিনি কোনো ছাত্র বা শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন না এবং তুচ্ছ বিষয়েও তোলপাড় সৃষ্টির প্রবণতা দেখান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কিছুদিনের জন্য ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকার পর সম্প্রতি তিনি পুনরায় ফিরে আসেন এবং তার আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সোমবার রাকসু ভবনে ছাত্র অধিকার পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ ও অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আম্মারের বাগবিতণ্ডা ঘটেছে। একাধিকবার নিজের চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে তিনি নেতাদের শাসান। এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে আম্মারের অশোভন আচরণ দেখা গেছে।
রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি মেহেদী মারুফ ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এতে তিনি লেখেন, “রাকসু ফরজ কাজ বাদ দিয়ে নফল কাজেই বেশি মনোযোগী ও পারদর্শী। হবেই না বা কেন? নফল দিয়েই যদি বৈতরণী পার হওয়া যায় তাহলে ফরজের আর দরকারটা কী!”
এই পোস্টের কমেন্টে আম্মার উত্তর দেন, “চুলকানি শুরু মলমের নাম নুরু।” এরপর সোমবার দুপুরে মারুফ ও কয়েকজন নেতাকর্মী রাকসু ভবনে আম্মারের দপ্তরে যান এবং জানতে চান, তিনি কেন তাদের নেতা, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরুকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, প্রতিবাদের মুখে কিছুটা বেকায়দায় পড়ে আম্মার পুরোপুরি অস্বীকার করেন, তিনি দাবি করেন ফেসবুক পোস্টে নুরুল হক নুরুকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি। একপর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে তুমুল বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এ সময় নিজের ভঙ্গিতে তর্জনী উঁচিয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে, প্রতিপক্ষকে বারবার হুমকি দেন।
মেহেদী মারুফ বলেন, “কয়েকদিন আগে রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে আমি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পোস্টের কমেন্টে তিনি বাজে মন্তব্য করেন। বিষয়টি জানতে চাইলে চটে গিয়ে আমাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। অনেক শিক্ষার্থীর ধারণা, তার মানসিক বিকৃতি ঘটেছে। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি কাউকে ‘মালখোর’, কাউকে ‘আবাল’ আবার কাউকে ‘চোদনা’ বলার মতো ইতর ভাষা ব্যবহার করেন। তার নৈতিক অবক্ষয় স্পষ্ট।” তিনি আরও জানান, ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আম্মারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
অভিযোগের জবাবে রাকসু জিএস আম্মার বলেন, “গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তারা এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। আমি সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করি। যে যেভাবে বিষয়গুলো দেখেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই।”
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আম্মারের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা যায় না। ফেসবুকে তার একটি বট বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। যারা তার অশোভন আচরণের প্রতিবাদ করে, তাদের ওপর এই বট বাহিনী আক্রমণ চালায়। শিক্ষকরা বলছেন, “এই বট বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। তাই কেউ কিছু বলতেও সাহস পায় না।”
একজন সিনিয়র শিক্ষক জানান, “আম্মার নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি হলেও তার আচরণ অসংযত। এক কথায় ছাত্রসুলভ নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৮ জানুয়ারি তিনি জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. নেছার উদ্দিনকে স্বাগত জানাতে প্যারিস রোডে টাঙানো ব্যানার নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছেন। ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন।” এই ঘটনায় রাবি শাখা ছাত্রদল ও শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং ভিসিকে আম্মারের মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় আম্মারের সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও, সরকার পতনের পর থেকে তিনি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে নাজেহাল করার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিনোদপুর বাজারে ৭ দিন বয়সি মেয়ের দুধ ও ওষুধ কিনতে গিয়ে মাসুদ অপহরণের শিকার হন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাসুদকে চটের বস্তায় ভরে মুখ বেঁধে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। এরপর তাকে প্রথমে মতিহার ও পরে বোয়ালিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় মতিহার থানায় হত্যা মামলা হয়েছে, কিন্তু কোনো তদন্ত শুরু হয়নি। এর আগে ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল ক্যাম্পাসে শিবিরের হামলায় মাসুদ একটি পা হারিয়ে পঙ্গু জীবন কাটান।
১৮ মাসে আম্মার বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মিডিয়ার তাজা খোরায় পরিণত হয়েছেন। বিশেষ ব্যক্তিদের টার্গেট করে ফেসবুকে উসকানি, বিদ্রূপাত্মক এবং ঘৃণামূলক পোস্ট দেন। নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে নিজেকে “জীবন্ত গাজী” বলে উল্লেখ করেছেন। তার আচরণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন।
২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পোষ্য কোটা সংক্রান্ত বিরোধে জুবেরি ভবনে উপ-উপাচার্য ড. মাঈন উদ্দীনকে আম্মার শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন। একজন উপ-রেজিস্ট্রারের দাঁড়ি টেনে ধরে তিনি ধস্তাধস্তি করেন। রাবি প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, কিন্তু এখনও প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
পোষ্য কোটা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ দেড় শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীকে দিনভর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আম্মার। এই ঘটনায়ও রাবি প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, কিন্তু প্রতিবেদন এখনও দেওয়া হয়নি। শিক্ষক ও কর্মকর্তারা কয়েক দিন কর্মবিরতি পালন করেছেন। জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের তিনটি সংগঠনও বিবৃতি দিয়েছেন। তারা দাবী করেছেন, “আম্মারের উগ্র আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।”
রাবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, “আম্মারের অসংযত ও উগ্র আচরণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিব্রত ও শঙ্কিত। তার বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কমিটিগুলো এখনও প্রতিবেদন দেয়নি। প্রতিবেদন জমা দিলে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

