বাংলাদেশে গত এক দশকে নতুন বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও এর বড় অংশ এখনো নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ভাড়া করা ভবন বা অস্থায়ী ব্যবস্থায়। এতে শিক্ষার মান, গবেষণা কার্যক্রম এবং সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা।
তাদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আধুনিক সুবিধা এবং যথাযথ একাডেমিক পরিবেশের অভাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি নতুন প্রতিষ্ঠিত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষা কার্যক্রমই শুরু হয়নি।
বর্তমানে দেশে মোট ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে বাকি ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। এর মধ্যে মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলো ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত, এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি এবং ইসলামিক আরবি ইউনিভার্সিটি এখনো নিজস্ব ক্যাম্পাসে পুরোপুরি স্থানান্তরিত হতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র চারটির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণকাজ চলমান। এগুলো হলো:
-
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
-
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি
-
এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
-
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়
এছাড়া নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি নিয়ে এখনো বিরোধ চলছে।
বাকি ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে ইউজিসির কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নির্দিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠার পর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান বলেন,
“একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু ২০০৮ সালের পর এই নিয়ম আর অনুসরণ করা হয়নি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে দেওয়া হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বজনপ্রীতি দায়ী।
একজন জ্যেষ্ঠ ইউজিসি কর্মকর্তা বলেন, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর একটি বড় উদাহরণ। সেখানে প্রায় ৫৫০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় ৪৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য মো. নজমুল আহসান জানান, তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখেছেন যে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কোনো উদ্যোগই আগে নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করা।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, যেখানে প্রয়োজন আধুনিক সুবিধা, দক্ষ জনবল এবং উন্নত অবকাঠামো। কিন্তু যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, সেখানে এসব সুবিধার বড় অভাব দেখা যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে তাড়াহুড়া করে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভাড়া ভবনে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমের মান নিশ্চিত করতে ইউজিসিকে আরও ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রান্ট ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন এডুকেশন কর্মসূচির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী বলেন,
“সরকার যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুমোদন দিয়েছে, তাই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারেরই।”
তিনি আরও বলেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে যে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে তা অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত নয়।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এসএমএ ফয়েজ বলেন, বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরে বিলম্ব হচ্ছে। তবে সরকার বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

