বর্তমানে আমাদের সমাজে সবচেয়ে আতঙ্কিত রোগের নাম হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক। যা নিমিষেই নিয়ে যাচ্ছে একটি তাজা প্রাণ। আর হার্ট অ্যাটাক মানেই বুকচাপা, তীব্র ব্যথা এই ধারণা অনেকের মধ্যে গেঁথে আছে। তবে সব হার্ট অ্যাটাক সে রকম হয় না। অনেক সময় এটি আসে নীরবে, শরীরকে ভিতরে ভিতরে ক্ষতিগ্রস্ত করে কিন্তু বাইরে তার তেমন স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না।
এমন হার্ট অ্যাটাককে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘সাইলেন্ট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’। এতে প্রচলিত লক্ষণ যেমন বুকের তীব্র ব্যথা অনুপস্থিত থাকে। ফলে অনেকেই এর হালকা উপসর্গগুলোকে গ্যাস্ট্রিক, স্ট্রেস বা ক্লান্তির মতো সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করে ফেলেন। এতে দেরিতে ধরা পড়ে রোগ এবং ততক্ষণে ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে অনেকটাই।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নীরব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কারণ তাদের উপসর্গগুলো অনেক সময় অতি সূক্ষ্ম হয় এবং নিজেরাই সেগুলোকে গুরুত্ব দেন না। ঘন ঘন ক্লান্তি, বমিভাব, অস্বস্তি, নিঃশ্বাসের কষ্ট বা উদ্বেগ এসব সাধারণ উপসর্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত।
নিচে এমন ৯টি লক্ষণ তুলে ধরা হলো। যেগুলো অনেক সময় হালকা বদহজম বা সাময়িক ক্লান্তি মনে হলেও- আসলে হতে পারে হার্টের জন্য বড় বিপদের পূর্বাভাস।
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি: নিত্যদিনের ছোট কাজেও যদি বারবার ক্লান্ত হয়ে পড়েন, আর এই ক্লান্তি যদি বিশ্রামের পরও না কমে, তা হলে সাবধান হোন। হার্ট ঠিকভাবে রক্ত পাম্প না করলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, যার ফলে ক্লান্তি ভর করে হঠাৎ ও বারবার।
- বুকের হালকা অস্বস্তি: তীব্র ব্যথা নয় বরং বুকের মাঝ বরাবর চাপ, টানটান অনুভব বা হালকা ব্যথা দেখা যেতে পারে। এই অনুভূতি স্থায়ী নাও হতে পারে কিন্তু বারবার এলে তা উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
- নিঃশ্বাসের কষ্ট: সামান্য হাঁটাহাঁটি বা বিশ্রামে থাকার সময়ও যদি নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তা হলে তা হতে পারে হার্টে রক্ত চলাচলের অসুবিধার কারণে। এই ধরনের লক্ষণকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
- বমিভাব বা বদহজম: খাবার না খেয়েও যদি অস্বস্তি, গা গুলানো বা হঠাৎ বমি আসার অনুভূতি হয়, তা অনেক সময় গ্যাস্ট্রিক নয়, বরং হার্টের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে যখন এই উপসর্গগুলো বারবার ফিরে আসে।
- মাথা ঘোরা বা হালকা হয়ে যাওয়া: হঠাৎ করে দাঁড়ালে মাথা ঘোরে, বা চারপাশ ঝাপসা লাগে? রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা থাকলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছানোয় এমন হতে পারে। এটি অবহেলা করলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- ঠান্ডা ঘাম: অকারণে হঠাৎ শরীর ঘেমে ওঠা, বিশেষ করে শীতল ঘাম এটি শরীরের চাপ বা ব্যথার প্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। কোনো শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই যদি এমন ঘাম হয়, তা হৃদযন্ত্রের বিপদের আলামত হতে পারে।
- উপরের অংশে ব্যথা: চোয়াল, গলা, পিঠ বা হাতের দিকে ছড়িয়ে পড়া হালকা ব্যথা অনেক সময় সাধারণ মাংসপেশির টান বলে মনে হয়। তবে বুকের ব্যথা ছাড়াও এই ধরনের ব্যথা নীরব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
- ঘুমের সমস্যা: রাতে ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া বা ঘুমিয়েও ক্লান্ত লাগা এগুলো হার্টের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। শরীরের ভেতরে অস্বস্তি থাকলে ঘুম ব্যাহত হয়, যা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।
- হঠাৎ উদ্বেগ বা অজানা ভয়: কোনো কারণ ছাড়া অস্থির লাগা, বুক ধড়ফড় করা বা মনে হওয়া ‘কিছু একটা ভুল হচ্ছে’- এই ধরনের অনুভূতি হার্ট অ্যাটাকের আগাম সংকেত হতে পারে। এটি শরীরের প্রতিক্রিয়া, যখন হৃদপেশিতে রক্ত কম যাচ্ছে।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ভয়াবহতা এখানেই যে, এর উপসর্গগুলো চোখ এড়িয়ে যায় সহজেই। তাই উপরের যে কোনো একটি লক্ষণ বারবার দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো সচেতন হলে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। হার্টের যত্ন নিন, কারণ তা নীরবে সঙ্কেত দিলেও- ক্ষতি করে যায় নীরবতায় নয়।

