পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা ১০ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের পর্যটন শিল্পে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, হাওর, বন কিংবা রিসোর্ট- সবখানেই পর্যটকদের আগাম বুকিং ও আগ্রহে খুশি সংশ্লিষ্টরা। হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও হাউজবোট প্রায় সর্বত্রই রুম প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, কিছু ক্ষেত্রে পুরোপুরি বুক হয়ে গেছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে দীর্ঘ ছুটি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি- এই দুইয়ের প্রভাবে এবার দেশীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বেড়েছে মানুষের আগ্রহ।

সবচেয়ে বেশি ভ্রমণপ্রেমী ছুটছেন দেশের দক্ষিণ-পূর্বের কক্সবাজারে। শহরের প্রধান হোটেলগুলো ইতোমধ্যেই অধিকাংশ রুম বিক্রি করে ফেলেছে।
সিগাল হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, “এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এবারের ঈদে কক্সবাজারে পর্যটকদের ঢল নামবে।”
৮ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত হোটেলের ৯০ শতাংশের বেশি রুম আগেই বুক হয়ে গেছে।
মারমেইড বিচ রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক রানা কর্মকার জানান, ঈদের ছুটির দশ দিনের মধ্যে ছয় দিন তাদের সব রুম বুক হয়ে গেছে।

শুধু কক্সবাজার নয়, সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকাও পর্যটকদের নজর কেড়েছে। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ঈদের পরদিন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত প্রায় সব হাউজবোট আগেই বুক হয়ে গেছে।
সিলেটের চা বাগান, জলপ্রপাত ও পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে- বিশেষ করে তরুণ পর্যটকদের মধ্যে। অনেকে এবার জনপ্রিয় গন্তব্য সাজেকের পরিবর্তে সিলেট-সুনামগঞ্জকেই বেছে নিচ্ছেন বর্ষার জন্য উপযোগী বলে।
এদিকে নেত্রকোনার বিরিশিরিও এবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ঢাকায় কর্মরত সিফাত আফরিন শামস বলেন, “রুম খোঁজার জন্য অনেক চেষ্টা করতে হয়েছে। ভালো মানের রুম আগেই বুক হয়ে গিয়েছিল।”
গাজীপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা ও অন্যান্য এলাকার রিসোর্টগুলোর অবস্থাও বেশ চমকপ্রদ।
খুলনার সুন্দরী ইকো রিসোর্টে প্রায় সব রুম আগেই বুক হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন সহকারী রেদোয়ান আহমেদ সিয়াম মনে করেন, “ইকো-ট্যুরিজমে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, সেটাই এই চিত্র স্পষ্ট করে।”

ময়মনসিংহের মেঘমাটি ভিলেজ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল কাফি জানান, ৮ থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত তারা পুরোপুরি বুকিংয়ে চলে গেছেন। তার মতে, “আগের বছর ঈদুল আজহায় ছোট ছুটি থাকায় মানুষ কম সময়ের ভ্রমণ পরিকল্পনা করত। এবার দীর্ঘ ছুটি পর্যটন শিল্পের জন্য আশীর্বাদ।”
ছুটি রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর ফেরদৌস বলেন, ইতোমধ্যেই তাদের ৬৫ শতাংশ রুম বুক হয়ে গেছে। তিনি এটিকে “পর্যটন শিল্পের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত” বলে মনে করেন।
গাজীপুরের নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্টের হিসাব ব্যবস্থাপক নিতাই চন্দ্র সূত্রধর জানান, “অনেকেই খোঁজ নিচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বুকিং আরও বাড়বে।”
তবে সাজেক ভ্যালিতে এবার আগের মতো চাহিদা দেখা যাচ্ছে না। ট্যুর গ্রুপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরানুল আলম জানিয়েছেন, “এবার সাজেকে প্রি-বুকিং তুলনামূলক কম। আবহাওয়া ও দূরত্ব হতে পারে অন্যতম কারণ।”

আন্তর্জাতিক বিমানের টিকিটের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদেশে যাওয়ার বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অধিকাংশ মানুষ এখন দেশের মধ্যেই ভ্রমণ করতে আগ্রহী।
হবিগঞ্জের প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের হেড অব সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং মোহাম্মদ তানভীর হাসান বলেন, “আগের ঈদে যাঁরা তিন দিনের পরিকল্পনা করতেন, এবার তাঁরা ৭-৮ দিনের রিজার্ভেশন নিচ্ছেন। এতে রিসোর্ট ব্যবসা চাঙা হয়েছে।”
পর্যটন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন দীর্ঘ ছুটি পর্যটন খাতের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি দেশের অর্থনীতির সাথেও এটি যুক্ত। অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিকাশ মানেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
তবে আবহাওয়া বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রিসোর্ট মালিকরা। বর্ষার সম্ভাব্য প্রভাব মাথায় রেখেও অনেকে বুকিং বাতিল না করে অপেক্ষা করছেন শেষ মুহূর্তের আবহাওয়া আপডেটের জন্য।

