জীবনের চেয়ে কি চাঁদা দামি?—এ প্রশ্ন এখন আর কাব্যিক নয়, বাস্তবতার ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজি একটি অঘোষিত সামাজিক শাসনে পরিণত হয়েছে, যেখানে নিরীহ মানুষ প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে। প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না তো! চাঁদা না দিলে হুমকি, হামলা এমনকি মৃত্যুও যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনা। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা মানুষের মনে গভীর অনিশ্চয়তা ও ভয় সৃষ্টি করছে। প্রশ্ন উঠছে- এখনো কি মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান?
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মবসন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মবের কারণে মানুষ কেবল জীবনের নিরাপত্তা হারাচ্ছেন না, নারীরা বিশেষ করে বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনেই প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে পিটিয়ে হত্যা এবং রাজধানীর মহাখালী এলাকার একটি হোটেলে দুই নারীর ওপর যুবদলের নেতাকর্মীদের নির্মম হামলা দেশের মব ও দলবদ্ধ সহিংসতার ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছে।

মিটফোর্ডের লাল চাঁদ হত্যা: চাঁদার জন্য প্রাণ হারানো-
৯ জুলাই সন্ধ্যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনেই লাল চাঁদকে শত শত মানুষের সামনে পিটিয়ে, পাথর ও ইট দিয়ে পিষে হত্যা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা হামলায় জড়িত। হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশের নানা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এই নৃশংসতা কেবল একটি ব্যক্তি নয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতার দৃষ্টান্ত। প্রকাশ্যে সহিংসতা, রাজনৈতিক দলগুলোর চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
মহাখালীর নারীর ওপর হামলা: নারী নিরাপত্তার সংকট-
গত মঙ্গলবার (১ জুলাই) রাতে রাজধানীর মহাখালী এলাকার জাকারিয়া ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যুবদলের বনানী থানা আহ্বায়ক মনির হোসেনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী দুই নারীর ওপর হামলা চালায়। হামলার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, শাড়ি পরা একজন নারী সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় পথরোধ করা হয় এবং আঘাত পেয়ে মেঝেতে পড়ে যান। আরেক নারীকেও মাটিতে ফেলে মারধর করা হয়। অন্তত ৮ থেকে ১০ জন পুরুষ এই হামলায় অংশ নেয় এবং হোটেলের ভাঙচুরের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। মামলায় মনিরসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

মবসন্ত্রাস: নারীর ওপর সহিংসতার নতুন মাত্রা-
মহাখালীর এই ঘটনা নারীদের নিরাপত্তার সংকট ও মবসন্ত্রাসের ভয়াবহ দিক তুলে ধরেছে। নারীদের ওপর এই ধরনের হামলা সমাজে নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। রাজনৈতিক দলের উগ্রতা এবং মবের ক্ষমতা কখনো কখনো নারীর মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হয়ে ওঠে।
মবের বিস্তার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতা-
মব সন্ত্রাসের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় গোষ্ঠী মব তৈরি ও নিয়ন্ত্রণে জড়িত। আর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন প্রয়োগে অনীহা, বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে মববৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
মবের প্রতি সরকারের দ্বিমুখী অবস্থান- কখনো ‘প্রেসার গ্রুপ’ কখনো ‘জনরোষ’ বলে আখ্যায়িত করা হলেও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া মবের ক্ষমতাকে উসকে দেয়।

আইনের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ-
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে পুলিশের সামনে জুতাপেটার ঘটনা, মিটফোর্ডের প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড এবং মহাখালীর নারীর ওপর হামলা স্পষ্ট করে যে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগ কতটা দুর্বল।
আইনের শাসন না থাকায় মব ক্ষমতায় উঠে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়, বিশেষ করে নারী ও দুর্বল জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত ঝুঁকির সম্মুখীন।
দায় কার?
যখন একজন মানুষ প্রকাশ্যে হামলার শিকার হন, আর শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে- তখন প্রশ্ন ওঠে, এই অসংবেদনশীলতার দায় কার? রাষ্ট্র কি ব্যর্থ? নাকি প্রশাসন চোখ বুজে আছে? নাকি জনগণও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ভয়কে মেনে নিতে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি পর্যাপ্ত দায়িত্ব পালন করছে? না কি তারা নিজেও কোনো চাপে? সরকার কি সত্যিই প্রতিশ্রুত ‘নিরাপত্তা’ দিতে পারছে? এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, কিন্তু উত্তর অনির্দিষ্ট। কারো দিকে সরাসরি আঙুল না তুলেও বলা যায়- যেখানে জীবন নিরাপদ নয়, সেখানে দায় এড়ানোর সুযোগ কি আদৌ কারো আছে?

মবসন্ত্রাসের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি-
আগামী নির্বাচনের সময় এসব মব-সন্ত্রাস দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও শান্তি বজায় রাখতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। মব প্রতিরোধে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং সমাজের সকল স্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
পরিশেষে, মব সন্ত্রাস কেবল অপরাধ নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চিহ্ন। লাল চাঁদের নির্মম মৃত্যু, উত্তরার সাবেক সিইসির উপর হামলা ও মহাখালী নারীর ওপর নির্যাতন মিলে দেশের আইনের শাসন ও মানবাধিকার কতটা সংকটে রয়েছে তা স্পষ্ট করে।
রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ প্রয়াস ছাড়া এই ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আজকের সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।
বিশ্লেষণে— এফ. আর. ইমরান, নিউজ ইডিটর; সিটিজেন’স ভয়েস

