সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছেলেবেলা থেকেই অত্যন্ত মনোযোগী ও মেধাবী ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজীবনে তার ধারাবাহিক উৎকর্ষ তাকে একজন জ্ঞানী ও দৃষ্টান্তমূলক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
১৯১৮ সালে তিনি মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। এরপর চট্টগ্রামে ফিরে এসে ব্রাহ্ম সমাজের প্রধান আচার্য্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতার শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ানবাজারের বিশিষ্ট উকিল অন্নদা চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত অধুনালুপ্ত ‘উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে’ অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময় তার বিপ্লবী দলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীরতর হয় এবং শিক্ষকতার কারণে তিনি ‘মাস্টারদা’ খ্যাতি অর্জন করেন।
বিপ্লবী ভাবধারায় দীক্ষিত সূর্য সেন দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকে একমাত্র তপস্যা হিসেবে নিয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তিনি সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে তিনি দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গের মনোবল গড়ে তোলেন।
সর্বাধিক পরিচিতি আসে ১৮ এপ্রিল ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মাধ্যমে। সূর্য সেন ও তার বিপ্লবী দল চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনে সমবেত হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এই অভিযানের সময় সূর্য সেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করেন। ফলস্বরূপ, চট্টগ্রাম চারদিনের জন্য সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত থাকে।

ইংরেজ প্রশাসন সূর্য সেনকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। অবশেষে, ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অস্ত্রসহ সূর্য সেন ও ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। এরপর ব্রিটিশরা তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে। তার দাঁত ভেঙ্গে দেওয়া হয়, হাড় ভেঙ্গে, হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে অজ্ঞান করা হয়। তার অর্ধমৃতদেহ শেষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
মাস্টারদা সূর্য সেনের আত্মবলিদান ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তার স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া কলকাতার মেট্রো, বিশেষ করে বাঁশদ্রোণী মেট্রো স্টেশনটি সূর্য সেনের স্মরণে ‘মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন’ নামে নামকরণ করা হয়েছে।
সূর্য সেন ছিলেন একজন মহান শিক্ষক, বিপ্লবী এবং দেশপ্রেমিক নেতা, যিনি নিজের ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে স্বাধীনতা অর্জন কোনো সময়ের একক প্রচেষ্টা নয়, বরং ধৈর্য, সাহস এবং আত্মত্যাগের ফল।
সংকলক: এফ. আর. ইমরান

