বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অস্বস্তি অবশেষে বিস্ফোরণের মুখ দেখল। নির্বাচনে অনিয়ম, ই-ভোটিং কারচুপি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)–এর বিদায়ী কমিটিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি বোর্ড নয়, বরং পুরো ক্রিকেট প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠন করেছে ১১ সদস্যের একটি নতুন অ্যাডহক কমিটি। এর নেতৃত্বে আনা হয়েছে দেশের অন্যতম সফল ক্রিকেটার তামিম ইকবালকে। মাঠের পারফরম্যান্সে যিনি বছরের পর বছর আস্থা অর্জন করেছেন, এখন তার কাঁধেই পড়েছে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব।
নতুন কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ফাহিম সিনহা, রফিকুল ইসলাম বাবু, সালমান ইস্পাহানি, তানজিল চৌধুরী, আতহার আলি খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, ইসরাফিল খসরু, সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ, মির্জা ইয়াসির আব্বাস এবং রাশনা ইমাম। তাদের অনেকেই ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিলেন, ফলে অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের একটি মিশ্রণ তৈরি হয়েছে এই বোর্ডে।
তবে এই কমিটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটাই—বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।
নতুন অ্যাডহক কমিটির প্রধান দায়িত্ব আগামী ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। কাগজে-কলমে এটি একটি প্রশাসনিক কাজ হলেও বাস্তবে এটি একটি আস্থার পরীক্ষা।
কারণ, আগের বোর্ডের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—সেগুলো শুধু নিয়ম ভাঙার ঘটনা নয়, বরং ক্রিকেট পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে নতুন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে কতটা স্বচ্ছভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় তার ওপর।
তামিম ইকবাল নিজেও জানিয়েছেন, তিনি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে চান। তবে বাস্তবতা হলো—তিনি নিজেও চাইলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। অর্থাৎ, তিনি একই সঙ্গে আয়োজক এবং সম্ভাব্য প্রার্থী—যা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করে।
এখানেই তার নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। তিনি কি প্রশাসনিক দায়িত্বকে ব্যক্তিগত সম্ভাবনার ওপরে রাখতে পারবেন? নাকি এই দ্বৈত অবস্থান নতুন বিতর্ক তৈরি করবে?
বিসিবির সাবেক কমিটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে—সমস্যা কেবল ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগতও। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরণের ক্ষমতার চক্র, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ এবং অস্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে একটি দুর্বল সিস্টেম তৈরি হয়েছিল।
এই অবস্থায় নতুন কমিটি শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; বরং তাদেরকে একটি টেকসই ও স্বচ্ছ কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পরিবর্তন সত্যিই নতুন যুগের সূচনা হবে, নাকি আবারও একই চক্রে ফিরে যাবে—তা নির্ভর করছে আগামী ৯০ দিনের ওপর।
তামিম ইকবাল এবং তার দল যদি সত্যিই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারেন, তবে এটি হতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট।
অন্যথায়, এটি কেবল আরেকটি ‘বোর্ড পরিবর্তন’-এর গল্প হয়ে থাকবে।

