বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) নতুন প্রধান কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে পরিমাণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন চিত্র তুলে ধরছে। কোচ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অভিজ্ঞ ও উচ্চমানের কোচদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়মিতভাবে জমা পড়ছে বাফুফেতে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল এবং গোলরক্ষক কোচ—সব ক্ষেত্রেই আবেদন সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে।
বাফুফে টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটন নিশ্চিত করেছেন, শুধুমাত্র জাতীয় দলের প্রধান কোচ হওয়ার জন্যই এখন পর্যন্ত ৩০০-এর বেশি আবেদন এসেছে। বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য প্রায় ১০০ জন কোচ তাদের সিভি জমা দিয়েছেন, আর গোলরক্ষক কোচ পদের জন্য আবেদন করেছেন প্রায় ৫০ জন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আবেদনকারীদের মধ্যে কারা ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার শীর্ষ পর্যায়ের কোচ, কিংবা কারা বিশ্বকাপে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন—তা এখনো যাচাই-বাছাই না হওয়ায় নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। হিলটন জানান, এখনো কোনো সিভি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির কাজ শুরু হবে।
এই দীর্ঘ তালিকা থেকে প্রাথমিক বাছাই করার জন্য আলাদা একটি কমিটিও গঠন করেছেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। জাতীয় দলের প্রধান কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়ার পুরো দায়িত্ব মূলত তিনিই দেখভাল করছেন। তার আগে অভিজ্ঞ কয়েকজন সদস্য মিলে প্রাথমিকভাবে তালিকাটি ছোট করা হবে।
যে আবেদনগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেখানে রয়েছে বেশ কিছু পরিচিত ও অভিজ্ঞ নাম। জার্মানির বার্নার্ড স্টর্ক তাদের মধ্যে অন্যতম। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে ১৪৬ ম্যাচ খেলেছেন। পরবর্তীতে ক্লাবটির সহকারী কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ২০০৬-০৭ মৌসুমে। কোচিং ক্যারিয়ারে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে হাঙ্গেরিতে, যেখানে তার নেতৃত্বে ২০১৬ সালে ৪৪ বছর পর ইউরোতে কোয়ালিফাই করে দেশটি। পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে তার অধীনে হাঙ্গেরির যুব দল শেষ ষোলোতে পৌঁছায়।
আবেদনকারীদের তালিকায় আরও আছেন ফ্রান্সের দিদিয়ের ওলে নিকোল, ক্রোয়েশিয়ার পিটার সেগার্ট, যিনি ২০১৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন, এবং দক্ষিণ সুদান ও কোমোরোস জাতীয় দলের সাবেক কোচ স্টেফানো কুসিন।
৫৮ বছর বয়সী মিওড্রাগ রাদুলোভিচের অভিজ্ঞতাও বেশ সমৃদ্ধ। তিনি দিনামো মস্কোতে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছেন এবং দুই দফায় লেবানন জাতীয় দলের প্রধান কোচ ছিলেন। ২০২০ সালে তাকে মন্টেনেগ্রো জাতীয় দলের দায়িত্বেও দেখা গেছে।
অন্যদিকে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব বার্মিংহাম সিটিতে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা জার্মান কোচ অ্যান্তোনে হে-ও বাংলাদেশের কোচ হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। একইভাবে গাম্বিয়া, লাইবেরিয়া, কেনিয়া এবং মিয়ানমারের মতো বিভিন্ন জাতীয় দলকে কোচিং করানো অভিজ্ঞ কোচ ইগর স্টিমাচও তার সিভি পাঠিয়েছেন বাফুফেতে। ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলের সাবেক এই ফুটবলার ও কোচ ভারতকে সাফ শিরোপা জেতানোর অভিজ্ঞতাও রাখেন।
তবে বর্তমান কোচ হাভিয়ের ক্যাবরেরার পুনরায় দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
এত বিপুল সংখ্যক হাইপ্রোফাইল কোচের আবেদন আসার ফলে বাফুফের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক বাছাই করা। এর পাশাপাশি বাজেট ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। যদিও আপাতত অর্থনৈতিক দিক নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছে না বাফুফে। সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হওয়ার পরই চূড়ান্ত খরচ ও বাজেট নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন হিলটন।
তিনি আরও মনে করেন, হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো খেলোয়াড়দের আগমন বাংলাদেশের ফুটবলে একটি নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে, যার ফলেই কোচদের মধ্যে এই বাড়তি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তার মতে, বাংলাদেশকে এখন অনেক কোচই একটি সম্ভাবনাময় দল হিসেবে দেখছেন এবং ভবিষ্যতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলেই তারা এখানে কাজ করতে আগ্রহী।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যেখানে সঠিক কোচ নির্বাচন ভবিষ্যতের উন্নতির পথ নির্ধারণ করতে পারে।

