প্যারিস অলিম্পিকে স্বর্ণ হাতছাড়া হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ব্রাজিলের নারী ফুটবলের কিংবদন্তি মার্তা ভিয়েরা দ্য সিলভা। এক বছরও পেরোয়নি, সেই ঘোষণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে আবারো ব্রাজিলের জার্সি গায়ে মাঠে ফিরেছেন তিনি। চলমান নারী কোপা আমেরিকায় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই ছয়বারের বর্ষসেরা ফুটবলার, আবারও শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর।
প্যারিস অলিম্পিকের পর জাতীয় দল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন মার্তা। তবে চলতি বছরের মে মাসের শেষদিকে কোচ আর্থুর ইলিয়াস তাকে আবারও দলে ফেরান দুটি প্রীতি ম্যাচের জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় মার্তাকে সঙ্গী করেই ইকুয়েডরে নারী কোপা আমেরিকায় অংশ নিতে যায় সেলেসাও নারীরা। সেখানে নিজের উপস্থিতিকে উপভোগ করছেন বলেও জানান ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা। মার্তা বলেন, ‘আমার দায়িত্ব পাল্টায়নি, অনুভবও একই আছে, আগের মতোই গর্ব নিয়ে খেলছি। আমি খেলি বা না খেলি, ব্রাজিলকে সাহায্য করার ইচ্ছা কখনোই শেষ হবে না।’
তবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘনিয়ে আসছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘দলের সঙ্গে প্রতিদিনের কাজ ও অনুশীলনে অংশ নিতে গিয়ে এখন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ অনুভব করি। আমি জানি, খুব বেশি সময় আর নেই। যতটা সময় পাই, সেটা যেন সেরা হয় সেটাই চাই।’ দুই দশকের ক্যারিয়ারে ব্রাজিলের হয়ে এখন পর্যন্ত মার্তা খেলেছেন ২০৪টি ম্যাচে, গোল করেছেন ১১৯টি।
২০২১ সালে টোকিও অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-০ গোলে হেরে ব্রাজিল রৌপ্য জিতেছিল। সেটিই ছিল মার্তার নেতৃত্বাধীন ব্রাজিলের সর্বশেষ বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা। এরপর মার্তা ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাকে দেখা যাবে না। তবুও সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসে আবারও মাঠে ফিরেছেন তিনি। পেশাদার ক্যারিয়ারেও থেমে যাননি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওমেন্স সকার লিগে (NWSL) ওরল্যান্ডো প্রাইডের হয়ে খেলছেন। ক্লাবটির সঙ্গে তার চুক্তি ২০২৬ সাল পর্যন্ত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্তা ৬টি করে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন। তবে শিরোপার স্বাদ এখনও অধরা। ২০০৭ সালে বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয় ব্রাজিল। তিনবার অলিম্পিক ফাইনালে পৌঁছেও প্রতিবারই রৌপ্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে। তবুও সাফল্যের সংখ্যায় এখনও তিনি কিংবদন্তির কাতারেই। খেলোয়াড়ি জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ছয়বার ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন মার্তা।
নারী কোপা আমেরিকার এবারের আসর বসেছে ইকুয়েডরে, এটি প্রতিযোগিতার দশম সংস্করণ। এই প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল, যারা ৮ বার শিরোপা জিতেছে। এবারের আসরেও দুর্দান্ত শুরু করেছে তারা। প্রথম ম্যাচে ভেনেজুয়েলাকে ২-০ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে বলিভিয়াকে বিধ্বস্ত করেছে ৬-০ ব্যবধানে। দুটি ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে ‘বি’ গ্রুপের শীর্ষে অবস্থান করছে ব্রাজিল। অপরদিকে ‘এ’ গ্রুপে দুই ম্যাচে ছয় পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে আর্জেন্টিনার মেয়েরা।
আগামী ২০২৭ সালে নারী ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে ব্রাজিলে। তখন মার্তার বয়স হবে ৪১ বছর। সেই আসরে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মার্তা সরাসরি কিছু না বললেও সম্ভাবনার দরজা পুরোপুরি বন্ধও করেননি। তিনি বলেন, ‘কোচ সবসময় একটা বিষয় পরিষ্কার করে দেন- বয়স নয়, দলের স্বার্থে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়। সেদিক থেকে আমি বিশ্বাস করি তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন। তবে এখনই এটা বলার সময় নয় যে, আমি বিশ্বকাপে খেলব। বিষয়টি নির্ভর করছে আমার দৈনন্দিন পারফরম্যান্স, অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার ওপর। তাই আমি বর্তমানে মনোযোগ দিচ্ছি।’
মার্তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নয়, পুরো নারী খেলাধুলার জগতের জন্যও এক অনুপ্রেরণা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এসে নিজের অভিজ্ঞতা, আবেগ ও নিষ্ঠা দিয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আরেকটি ট্রফি হাতে তুলতে পারবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ব্রাজিলের জার্সিতে তার প্রত্যাবর্তনই প্রমাণ করে, কিংবদন্তিরা কখনো হার মানেন না।

