বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক লেগেই আছে। ঘরের মাঠে ‘টিপিক্যাল মিরপুর উইকেট’ অর্থাৎ মন্থর, নিচু বাউন্স এবং ব্যাটসম্যানদের খেলায় জটিলতা সৃষ্টি করে এমন উইকেটের কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা অনেকসময়ই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এই উইকেট ঘিরে বিসিবির কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শ্রীলঙ্কার গামিনি সিলভা, যিনি ২০১০ সাল থেকে দায়িত্বে থাকার পর সাত দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ পর্যন্ত উইকেটের মান নিয়ে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদীনের পক্ষ থেকে এবার স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে মিরপুরের উইকেটে ‘টিপিক্যাল’ বা কঠিন ও মন্থর উইকেট ব্যবহার করা হবে না। বরং ঘরের মাঠের ফায়দা নেওয়ার পাশাপাশি ক্রিকেটের গুণগত মান বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ‘স্পোর্টিং’ উইকেটে খেলা হবে, যেখানে বলের বাউন্স থাকবে, ব্যাটসম্যান খেলতে পারবে স্বাচ্ছন্দ্যে এবং খেলা হবে দর্শক-বান্ধব পরিবেশে।
২০১০ সালে গামিনি সিলভার হাত ধরে শুরু হলেও গত বছরের জুলাই মাসে পদত্যাগ করেছেন এই শ্রীলঙ্কান কিউরেটর। এরপরই বিসিবি পুনরায় ফিরিয়ে এনেছে সাবেক ইংরেজ কিউরেটর টনি হেমিংকে, যিনি বর্তমানে ‘হেড অব টার্ফ ম্যানেজমেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নাজমুল আবেদীন বলেন, হেমিংয়ের কাজ ও দক্ষতা দেখে তিনি পাকিস্তানে পিএসএলসহ অন্যান্য টুর্নামেন্টে তৈরি উইকেটের মান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে অনেক বেশি ক্রিকেট হয়, সেখানে সুনিপুণ কিউরেটিংয়ের ফলে এত ভালো উইকেট থাকা একটি অনুপ্রেরণা হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।
নাজমুল আরও বলেন, গামিনি সিলভার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধতা ছিল যা তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এর ফলে বিসিবি আরও উন্নত উইকেটের জন্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ভালো উইকেট কোচ বা খেলোয়াড়ের থেকেও বেশি সহায়ক হতে পারে একটি দলের ক্রিকেট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।
সর্বশেষ পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে দেখা গেছে মিরপুরে ‘টিপিক্যাল’ উইকেটের চিহ্ন—মন্থর, কঠিন এবং কঠিন শট খেলায় অক্ষমতা। এই উইকেট নিয়েও দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স হতাশ ছিলেন বলে জানা গেছে। নাজমুল নিশ্চিত করেছেন, দলের চাওয়া ছিল না এমন উইকেটে খেলা, আর ভবিষ্যতে তারা এধরনের উইকেট ব্যবহার এড়িয়ে যাবে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ আগামীতে এমন কোনও পরিস্থিতি মেনে নেবে না যেখানে ‘টিপিক্যাল’ মিরপুরের মতো উইকেটে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। বরং নতুন মানসম্পন্ন স্পোর্টিং উইকেট নিয়ে দলের সামগ্রিক উন্নতি লক্ষ্য করা হবে। মিরপুরে ভবিষ্যতে ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি কিংবা টেস্ট যেকোনো ফরম্যাটেই ক্রিকেটাররা নিজেদের সেরাটা দিতে পারবে এমন উইকেট গড়ে তোলা হবে।
বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররাও ইতিমধ্যেই ‘টিপিক্যাল’ মিরপুর উইকেটের পরিবর্তে ভালো, বাউন্স ও বল-প্যাটির সুবিধাসম্পন্ন উইকেট চাচ্ছেন। অধিনায়ক লিটন দাসও এই পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভালো উইকেটে খেলা হলে ব্যাটসম্যানরা সহজে খেলতে পারবে এবং দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিসিবির এই পরিবর্তন ও নতুন পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন পুরনো ও কঠিন উইকেটের জঞ্জাল থেকে মুক্তি পেতে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক মানের উইকেট গড়ে তোলার মাধ্যমে ক্রিকেটের গুণগত মান ও ফলাফল উভয়ই উন্নত করার মনোভাব নিয়ে এগোচ্ছে।
এমন পদক্ষেপ ক্রিকেট প্রেমীদের মাঝে আশাবাদ জাগিয়েছে যে, মিরপুরের মাঠে ভবিষ্যতে দর্শকরা দেখবেন প্রাণবন্ত, উত্তেজনাপূর্ণ ও উচ্চমানের ক্রিকেট, যেখানে খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরাটা দিতে পারবে এবং ঘরের মাঠের খেলায় সত্যিকারের সুবিধা ভোগ করবে বাংলাদেশ দল।

