একজন ক্রিকেটারের জীবনে ক্রিকেটের চেয়ে বড় কী হতে পারে? বেশিরভাগই বলবেন—কিছুই না। কিন্তু শোয়েব আখতারের ক্ষেত্রে উত্তরটা আলাদা। তার কাছে দেশের ডাক ছিল সবার আগে। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন তিনি। সে সময় ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ার তাকে প্রায় পৌনে দুই লাখ পাউন্ডের মোটা অঙ্কের চুক্তি দিয়েছিল, যা অনেক ক্রিকেটার চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করত। কিন্তু শোয়েব? বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’-এর গল্পে রঙিন কাহিনির শেষ নেই। তার জীবন যেন ক্রিকেট মাঠের মতোই—কখনো উচ্ছ্বাসে ভরা, কখনো বিতর্কের ঝড়ে আলোড়িত।
উত্থানের ঝলক
১৯৯৯ সালের এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত সফরে গিয়েছিল পাকিস্তান। ম্যাচের মাঝে হঠাৎই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ২৪ বছরের এক তরুণ পেসার। রাহুল দ্রাবিড়কে ফেরানোর পর পরের বলেই শচীন টেন্ডুলকারকে বোল্ড! শচীন এর আগে ক্যারিয়ারে মাত্র একবার প্রথম বলে আউট হয়েছিলেন—সেই তালিকায় দ্বিতীয়বারের নাম লেখালেন শোয়েব আখতার।
এমন নাটকীয় মুহূর্ত তিনি একাধিকবার উপহার দিয়েছেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ১৬ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানকে ফাইনালে তুলতে বড় অবদান রেখেছিলেন। ২০০২ সালে লাহোরের ব্যাটিং-বান্ধব উইকেটে নিউজিল্যান্ডকে মাত্র ৭৩ রানে গুটিয়ে দিয়ে ৮.২ ওভারে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। যদিও ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন ইনজামাম-উল-হক, সেই দিনে আসল ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন শোয়েবই।
গতির রেকর্ড আর স্বপ্নভঙ্গ
ক্রিকেট ইতিহাসে কয়েকজন বোলারের নামই ১৫০ কিমি/ঘণ্টার ওপরে নিয়মিত বল করার জন্য পরিচিত। কিন্তু শোয়েব চেয়েছিলেন আরও দূরে যেতে—১০০ মাইল প্রতি ঘণ্টার বাধা ভাঙতে। ২০০৩ সালে সেই রেকর্ড গড়েনও তিনি, হয়ে ওঠেন বিশ্বের প্রথম বোলার যিনি এই গতি স্পর্শ করেছেন।
কিন্তু গতি যতই ছিল, চোটও ততই ছিল পিছু নেয়ার মতো ছায়া। হাঁটু ও পিঠের সমস্যায় ভুগতে ভুগতে কখনো কখনো সকালে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়ত তার জন্য।
বিতর্কের সাথে সহাবস্থান
চোট সামলে ফেরার ক্ষমতা তার ছিল, কিন্তু শৃঙ্খলাভঙ্গের ইতিহাস তার ক্যারিয়ারের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সতীর্থকে মারধর করে নিষিদ্ধ হওয়া, ডোপ টেস্টে ফেল—এমন কত বিচিত্র কারণেই না দল থেকে ছিটকে গেছেন। ট্রফি জেতা বা দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে একের পর এক।
তবুও, যখন তিনি রানআপ নিয়ে বল হাতে এগোতেন, দর্শক আসনে একধরনের বিদ্যুৎ খেলে যেত। তার ইয়র্কার, বাউন্সার বা নিখুঁত আউটসুইং—সবই ছিল নিখাদ বিনোদনের উপকরণ।
পাকিস্তানের প্রতিচ্ছবি
শোয়েব শুধু একজন বোলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন পাকিস্তানি ক্রিকেটের প্রতিচ্ছবি। চলতি শতাব্দীর শুরুতে দলটির ডাকনাম ছিল ‘দ্য আনপ্রেডিক্টেবলস’—অর্থাৎ যাদের পারফরম্যান্স আগে থেকে আন্দাজ করা যায় না। একদিন তারা বিশ্বসেরা দলকে গুঁড়িয়ে দেবে, পরের দিন হেরে বসবে দুর্বলতম প্রতিপক্ষের কাছে। শোয়েবও ছিলেন তেমনই—একদিন স্পেলে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ ধসিয়ে দেবেন, আবার কোনো বিতর্কে জড়িয়ে নিষিদ্ধও হয়ে যাবেন।
ট্রফি বা পরিসংখ্যান দিয়ে শোয়েব আখতারকে বিচার করা অন্যায় হবে। তিনি ক্রিকেটকে দিয়েছেন তার কাঁচা গতি, অদম্য লড়াইয়ের মনোভাব আর বিনোদনের নিশ্চয়তা। আর এই কারণেই তিনি ক্রিকেট ইতিহাসে এক অনন্য চরিত্র হয়ে থাকবেন—যত বিতর্কই তার সাথে যুক্ত থাকুক না কেন।



