কিডনি প্রতিস্থাপনের পর নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন ফাতিমা রশীদ। সেই নতুন জীবনকেই প্রমাণ করেছেন ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যের মাধ্যমে। জার্মানির ড্রেসডেনে অনুষ্ঠিত ২৫তম বিশ্ব ট্রান্সপ্ল্যান্ট গেমসে জ্যাভলিনে সোনা ও ২০০ মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জ জিতে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও বাংলাদেশের পতাকা হাতে তুলে ধরে নিজের শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এই অনুপ্রেরণাদায়ী নারী।
হঠাৎ ধরা পড়া রোগ ও জীবনের লড়াই-
ঢাকায় জন্ম নেওয়া ফাতিমা ওমানে বেড়ে ওঠেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে তাঁর। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সত্ত্বেও এর কারণ খুঁজে পাননি। চিকিৎসকেরা ওষুধের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দেন। এরপর ২০১৪ সালে গর্ভধারণ করলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। আট সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় জানা যায়, তাঁর কিডনি ফেইলিউরের তৃতীয় ধাপ—স্টেজ ৩বি।
একলাম্পসিয়ার মতো জটিল অবস্থার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে সন্তান জন্ম দিতে স্পেনে যান ফাতিমা। সেবছরই প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম দেন তিনি। শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও সন্তানের জন্মের পর মা হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন তিনি। কিন্তু কিডনির কার্যকারিতা নেমে আসে ৪৫-এ। এরপর থেকে শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও সতর্ক জীবনযাত্রার অধ্যায়।
কিডনি প্রতিস্থাপনের গল্প-
কিডনির ক্রমাবনতিশীল অবস্থার মধ্যেও মানসিকভাবে দৃঢ় থাকেন ফাতিমা। নিজের গল্প শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২২ সালে স্কুবা ডাইভিং করার সময় হিট স্ট্রোক হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। চিকিৎসকেরা জানান, প্রতিস্থাপন ছাড়া উপায় নেই।
পরিবারের সদস্যরা কিডনি দান করতে এগিয়ে এলেও কারও রক্তের গ্রুপ বা বয়স মেলেনি। অবশেষে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মৃতদাতার দান করা একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাঁর শরীরে। প্রতিস্থাপনের মাত্র এক মাস পরই তিনি দৌড়ে অংশ নেন, উদযাপন করেন নিজের নতুন জীবন। তাঁর কথায়, “আমার মনটা তখন ভীষণ খুশি ছিল। আমি বেঁচে আছি, নতুন করে বেঁচে আছি।”

স্বপ্নপূরণের মঞ্চে ফাতিমা-
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ফাতিমা চেয়েছিলেন ২০২৩ সালের বিশ্ব ট্রান্সপ্ল্যান্ট গেমসে অংশ নিতে, কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর নির্দিষ্ট সময় পার না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এবছর সুযোগ আসতেই নিবন্ধন করেন চারটি ইভেন্টে। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতেও নানা বাধা আসে, তবে থামেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত জার্মানির আসরে তিনটি বিভাগে প্রতিযোগিতা করে সোনা ও ব্রোঞ্জ জেতেন।
বিশ্ব ট্রান্সপ্ল্যান্ট গেমস ১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ডে শুরু হয়। এখানে প্রতিস্থাপিত অঙ্গ নিয়ে বেঁচে থাকা ও অঙ্গদাতারা অংশ নেন। এবারের প্রতিযোগিতায় ৫১ দেশ থেকে প্রায় আড়াই হাজার প্রতিযোগী অংশ নেন ১৭টি বিভাগে। ফাতিমার জয় সেই মঞ্চে বাংলাদেশকেও উজ্জ্বল করেছে।
অনুপ্রেরণার বার্তা-
সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে খেললেও ফাতিমা গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা হাতে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “আমি চেয়েছি দেশের মানুষকে জানাতে, কিডনি প্রতিস্থাপন মানেই জীবন শেষ নয়। প্রতিস্থাপনের পরও স্বপ্ন পূরণ করা যায়। আমার মতো অ্যাথলেট হতে হবে এমন নয়; যার যে স্বপ্ন, সেটার জন্য চেষ্টা করতে হবে।”
বর্তমানে দুবাইয়ে স্বামী-সন্তানের সঙ্গে থাকেন ফাতিমা রশীদ। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় শুধু চিকিৎসা বা খেলাধুলার গল্প নয়, এটি সাহস, অধ্যবসায় ও আশার এক অনন্য বার্তা।

