বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে আজ আরেকটি নতুন অধ্যায় যোগ হলো । দ্বিতীয় টেস্টে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিম প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১০০ টেস্ট খেলার ক্লাবে প্রবেশ করলেন।
২০০৫ সালে লর্ডসে সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে যখন তিনি অভিষেক করেছিলেন, তখন কেউ ভাবেনি—এই ক্ষুদে উইকেটকিপার-ব্যাটার একদিন দেশের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে লম্বা পথচলার প্রতীক হয়ে উঠবেন।
দুই দশকজুড়ে টেস্ট খেলে যাওয়ার অর্জন ক্রিকেট বিশ্বে খুবই বিরল। ২০০০–পরবর্তী সময়ে এই তালিকায় শুধু জেমস অ্যান্ডারসন, ব্রেন্ডন টেলর এবং এখন মুশফিকুর রহিম—মাত্র তিনজন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা, প্রতিশ্রুতি ও অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি বলতে হলে মুশফিকের নামই সবার আগে আসে।
টেস্ট ক্যারিয়ারে তিনি করেছেন নানা ভূমিকা—
-
৩৪ ম্যাচে অধিনায়কত্ব,
-
৫৫ ম্যাচে উইকেটকিপিং,
-
আর সবচেয়ে বড় পরিচয়: বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।
৬০০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়া একমাত্র বাংলাদেশি ব্যাটার তিনি। ১০০০ রানের ওপরে যারা আছে—সবার মধ্যে তার ব্যাটিং গড় (৩৮.০২) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, শুধুমাত্র তামিম ইকবালের নিচে। টেস্ট সেঞ্চুরিও রয়েছে ১২টি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

২০১৩: যে বছরটি পাল্টে দিয়েছিল সবকিছু
ক্যারিয়ারের প্রথম ৩০ টেস্টে তার গড় ছিল মাত্র ২৮.৮৫। ওই সময়ে বাংলাদেশের টেস্ট জয়ও ছিল খুবই কম—৩৯ ম্যাচে মাত্র দুটি, তাও দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।
কিন্তু ২০১৩ বছরটি হয়ে ওঠে মোড় ঘোরানো।
সেই বছর গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি করেন বাংলাদেশি ক্রিকেটারের প্রথম টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরি (২০০)। বছরের শেষে তার গড় দাঁড়ায় ৫৪.৪৫—এটাই ছিল তার প্রথম ‘৫০+’ বছর।
এরপর শুরু হয় তার দ্বিতীয় ইনিংস—
-
২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৯,
-
২০২০ সালে আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০৩,
তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি মিলে তিনি হয়ে ওঠেন ক্রিকেট ইতিহাসে পাঁচ নম্বর বা নিচে ব্যাট করে তিনটির বেশি ডাবল সেঞ্চুরি করা মাত্র তৃতীয় ব্যাটার।
বিশ্ব ক্রিকেটে একমাত্র উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করার রেকর্ডও তার।
২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিনি ৬৯ টেস্টে গড় করেছেন ৪২.৫৩, করেছেন ১১ সেঞ্চুরি। এই সময়েই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এক নতুন প্রতিযোগিতা ও আত্মবিশ্বাস দেখা দেয়—জয়ের হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশের ওপরে।
এই পুরো সময়টায় বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার ছিলেন মুশফিক—একমাত্র ব্যাটার যিনি এই সময় ১০০০ রানের বেশি করেছেন ৪০+ গড়ে।
বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য
মুশফিকুর রহিম শুধু ঘরোয়াই নন—বিদেশের মাঠেও বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ভরসা দিয়েছেন।
-
বিদেশে তার রান ২৭৪৮,
-
সেঞ্চুরি ছয়টি—দুটোই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০২৪ সালের টেস্টে তার ১৯১ রান এখনো বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের জয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর।
বাংলাদেশের প্রথম ৯টি বিদেশি টেস্ট জয়ের মধ্যে ৮টিতেই তিনি ছিলেন দলের অংশ—যা তার প্রভাব আরও স্পষ্ট করে।
মুশফিকের প্রতি উইকেট খোয়ানোর আগে গড়ে ৭৮.৬ বল খরচ হয়—এটি বাংলাদেশের যেকোনো টেস্ট ব্যাটারের সর্বোচ্চ। তাই বড় জুটির সঙ্গে তার সম্পর্কও গভীর—বাংলাদেশের ছয়টি ২৫০+ জুটির মধ্যে পাঁচটিতেই মুশফিক ছিলেন।
ছয় দেশে সেঞ্চুরি—একমাত্র বাংলাদেশি
বাংলাদেশের আর কেউ ছয় দেশে টেস্ট সেঞ্চুরি করতে পারেননি।
আর এশিয়ার চারটি টেস্ট খেলা দেশের প্রতিটিতেই সেঞ্চুরি আছে শুধু তার নামেই।
মুশফিকের ১২ সেঞ্চুরির ১০টিই এসেছে প্রথম ইনিংসে।
প্রথম ইনিংসে ১০০০+ রান করা বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে ৪০-এর ওপরে গড় রয়েছে শুধু তার—যা তার মানসিক দৃঢ়তা ও কন্ডিশন বোঝার ক্ষমতার প্রমাণ।
নায়কত্ব, কিপিং—সব চাপ সামলে আরও ভালো ব্যাটিং
-
৩৪ ম্যাচে অধিনায়ক,
-
৫৫ ম্যাচে কিপার,
তার ওপর ২৮ ম্যাচে দুই ভূমিকাই একসঙ্গে সামলিয়েছেন—যেখানে এই রেকর্ডে তার উপরে আছেন কেবল এমএস ধোনি (৬০ ম্যাচ)।
কিপার হিসেবে তার ব্যাটিং গড় ৩৭, আর শুধু ব্যাটার হিসেবে ৩৯.৩৮।
অধিনায়কত্ব করলেও তার ব্যাটিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং উল্টো গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৪১.৪৪।
উইকেটের পেছনে তার ৯৮ ক্যাচ ও ১৫ স্টাম্পিং—মোট ১১৩টি—তাকে বাংলাদেশের কিংবদন্তি কিপার-ব্যাটার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম—মুশফিকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল ভেন্যু। এখানে তার সংগ্রহ ৫০০০ রান, যা কোনো ক্রিকেটারের এক ভেন্যুতে খেলা সর্বোচ্চ রান হিসেবে বাংলাদেশের রেকর্ড।
তাই ১০০তম টেস্টের এই মঞ্চটিকে আরও প্রতীকী করে তুলেছে।
মুশফিকুর রহিম শুধু রেকর্ডের মালিক নন—তিনি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের মানসিক শক্তি, ধৈর্য ও লড়াইয়ের প্রতীক। দুই দশকের পথচলা শেষ হচ্ছে না—বরং ১০০তম টেস্ট নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

