টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এমন এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি), যা গোটা ক্রিকেটবিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পর বাংলাদেশকে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি। বাংলাদেশের জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বে চতুর্থ হওয়া স্কটল্যান্ডকে।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে আইসিসির নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। ক্রিকেটবিশ্বের অনেকেই এই ঘটনাকে শুধু একটি ক্রীড়াবিষয়ক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ক্ষমতা ও প্রভাবের লড়াই হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) থেকে। আইসিসির সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিচারিতা’ আখ্যা দিয়ে বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। পিসিবির চেয়ারম্যান ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি জানিয়েছেন, পাকিস্তান এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে কি না—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে শুক্রবার অথবা সর্বোচ্চ আগামী সোমবারের মধ্যে।
এর ফলে ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আদৌ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়েই বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আইসিসি ও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা। দ্য ওয়্যার–এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আইসিসি কার্যত বিসিসিআইয়ের প্রভাবমুক্ত কোনো সংস্থা নয়।
শারদা উগ্রার ভাষায়, “আইসিসি আসলে বিসিসিআইয়ের দুবাই অফিস ছাড়া আর কিছুই নয়।” তার এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে—আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিচালনায় ভারতের প্রভাব কতটা গভীর।
বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে উগ্রা বলেন, একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার—মোস্তাফিজুর রহমান—নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আলাদাভাবে চিহ্নিত হওয়ার পর পুরো দল যখন ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায় আইসিসির ছিল। কিন্তু সেই জায়গায় গিয়ে সংস্থাটি সহজ পথ বেছে নেয়—বাংলাদেশকে সরিয়ে দেওয়া।
ভারত সরকারের সরাসরি নির্দেশ ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলেও উল্লেখ করেন উগ্রা। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সংকটের পেছনে ভারতের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বিসিসিআইয়ের প্রভাব, আইসিসির ভেতরে তাদের আধিপত্য এবং আইসিসি বোর্ডে থাকা অন্যান্য দেশের নীরব বা নতজানু অবস্থানই এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
উগ্রা আরও বলেন, ক্রিকেটবিশ্বে ভারতের বিপুল আর্থিক ক্ষমতা এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতাকে আরও শক্ত করেছে। তার মতে, “ভারতীয় ক্রিকেটের অর্থনৈতিক শক্তিই আইসিসিকে এমন অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে কিছু দেশের আপত্তিকে নিয়মের মধ্যে পড়ে বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ যদি ভারতে গিয়ে খেলতে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ একই যুক্তি অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না।”
আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন এই অভিজ্ঞ সাংবাদিক। তিনি বলেন, ক্রিকেট অঙ্গনে এটি এখন ওপেন সিক্রেট যে আইসিসি মূলত বিসিসিআই যেভাবে চায়, ঠিক সেভাবেই পরিচালিত হয়। আইসিসির এক্সিকিউটিভ বোর্ডও প্রায় একই সুরে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে তিনি মোটেও বিস্মিত নন।
সব মিলিয়ে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি দলের অংশগ্রহণ বা বর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ন্যায্যতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আইসিসির ভূমিকা নিয়ে। আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তই বলে দেবে—এই বিশ্বকাপ কেবল মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মাঠের বাইরের রাজনীতিই হয়ে উঠবে এর প্রধান গল্প।

