বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র চার দিন। কিন্তু মাঠে বল গড়ানোর আগেই ক্রিকেট দুনিয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মাঠের বাইরের রাজনীতি, বয়কট আর কূটনৈতিক টানাপোড়েনে। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক, এরপর আইসিসির বিরুদ্ধে পিসিবি সভাপতির দ্বিচারিতার অভিযোগ—সবশেষে এসে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা। সব মিলিয়ে বিশ্বক্রিকেটে এখন এক ধরনের থমথমে অস্বস্তিকর পরিবেশ।
এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলেছে, তারা রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারের অবস্থানকে সম্মান করে, কিন্তু ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট বিশ্বক্রিকেটের সামগ্রিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইসিসির মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু পাকিস্তানের ক্রিকেট নয়, বৈশ্বিক ক্রিকেট ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—যার অংশীদার ও সুবিধাভোগী হিসেবে পিসিবিও জড়িত।
আইসিসি তাদের বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে না গড়ালে বিশ্বক্রিকেটের ইকোসিস্টেমে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। এই একটি ম্যাচের সঙ্গে যুক্ত থাকে ক্রিকেট বোর্ড, খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিসিয়াল, স্পন্সর, সম্প্রচার সংস্থা ও বিজ্ঞাপনদাতা—সব মিলিয়ে বিশাল এক অর্থনৈতিক বলয়।
১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা আসে। যদিও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি, তবুও সরকারের ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়েই আইসিসি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম জিও সুপার জানায়, এই পরিস্থিতি নিয়ে আইসিসি গতকাল ভার্চুয়ালি তাদের এপেক্স বোর্ডের জরুরি বৈঠক করেছে। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটিন বলছে, সভাটি আজ অথবা বৃহস্পতিবার হতে পারে। এই বৈঠকেই পাকিস্তানের অবস্থানের পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগেও বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে এমন বোর্ড মিটিংয়েই ভোটাভুটি হয়েছিল।
ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের হিসাব অনুযায়ী, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ না হলে আইসিসি প্রায় ২০০ কোটি রুপি সম্ভাব্য আয় হারাতে পারে। সাধারণভাবে ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচের বাণিজ্যিক মূল্য যেখানে প্রায় ১০০ কোটি রুপি, সেখানে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটির মূল্য দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ভারতের রিভ স্পোর্টজ জানাচ্ছে, এই ম্যাচটির বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা রুপিতে প্রায় ৩৪৮ কোটি। অন্যদিকে এনডিটিভির হিসাব আরও বড়—সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, টিকিট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক আয়ের হিসাব মিলিয়ে ম্যাচটির মোট মূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৬ হাজার ১২০ কোটি টাকা।
আইসিসির আয় কমলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে সদস্য দেশগুলোর রাজস্ব বণ্টনে। বিশেষ করে সহযোগী দেশ ও ছোট পূর্ণ সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তারা বড় অংশে আইসিসির অর্থের ওপর নির্ভরশীল।
আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ পায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। ফলে ক্ষতি হলে বড় অংশের ধাক্কা ভারতের দিকেই আসবে। যদিও ভারতের প্রধান আয়ের উৎস আইপিএল এবং নিজ দেশে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ, তবুও সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে সুনামের জায়গায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সম্প্রচার সংস্থা ও স্পন্সররা আগ্রহ হারাতে পারে। সেটিই ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি।
পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বেচ্ছায় ভারত ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্তকে ‘ফোর্স মাজিউর’ বা অনিবার্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। ফলে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই পিসিবির।
আইসিসির ‘মেম্বার পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ ভঙ্গের অভিযোগে পাকিস্তানের পাওনা অর্থ আটকে যাওয়া, জরিমানা কিংবা রাজস্ব বণ্টনের অংশ কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পিটিআই জানাচ্ছে, পিসিবির ওপর অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও আসতে পারে।
এর বাইরে আরও কঠোর সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না—শীর্ষ চার দলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বাতিল, পিএসএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের অনাপত্তিপত্র না দেওয়া কিংবা ভবিষ্যতে পাকিস্তানে আইসিসি টুর্নামেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে বাধা। বিশেষ করে ২০২৮ সালে পাকিস্তানে নির্ধারিত নারী বিশ্বকাপ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তাই প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠছে—এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেবে? মাঠের বাইরের এই উত্তাপ কি মাঠের ক্রিকেটকেও ছাপিয়ে যাবে?

