এক লাখ ত্রিশ হাজার দর্শকের গর্জনে ভরা বিশাল গ্যালারি—এমন মঞ্চে ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখবে না, এমন দল খুব কমই আছে। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোর একটি। তাই এখানে ফাইনাল জেতা মানেই স্মরণীয় এক ইতিহাস লেখা।
কিন্তু ভারতের জন্য এই মাঠ যেন ঠিক উল্টো গল্প বলে। সাফল্যের বদলে এখানে বারবার ফিরে এসেছে হতাশা। তাই আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি২০ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ভারতীয় শিবিরে উত্তেজনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু অদ্ভুত সতর্কতা, এমনকি কুসংস্কারও।
২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতি এখনো তাজা ভারতীয় সমর্থকদের মনে। সেই ম্যাচেই ট্র্যাভিস হেডের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিধ্বস্ত হয়েছিল রোহিত শর্মার দল। লাখো সমর্থকের সামনে ভারতের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল সেই রাতেই।
এরপর থেকে আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতের পারফরম্যান্স প্রায় নিখুঁত বলা যায়। তারা মোট ৩১ ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছে—আর সেই হারটিও এসেছে এই একই মাঠে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।
এই কারণেই মোদির স্টেডিয়ামকে ঘিরে ভারতের মনে যেন এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে।
ফাইনালের আগে ভারতীয় দলের প্রস্তুতিতে দেখা গেছে কিছু অদ্ভুত সিদ্ধান্ত।
দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর ইতোমধ্যেই পিচ নিয়ে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি চান লাল ও কালো মাটির মিশ্রণে একটি ‘হাইব্রিড’ পিচ তৈরি করা হোক, যাতে খেলার ভারসাম্য ঠিক থাকে।
এদিকে অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবও আগেরবারের হোটেলে থাকতে রাজি হননি। দলের জন্য নতুন হোটেল বেছে নেওয়ার শর্ত দিয়েছেন তিনি।
তারকা পেসার জাসপ্রীত বুমরাহও নাকি ড্রেসিংরুম নিয়ে আলাদা অনুরোধ করেছেন—অতিথিদের জন্য নির্ধারিত ড্রেসিংরুমটাই তিনি দলের জন্য চেয়েছেন।
সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, মাঠের ভেতরের প্রস্তুতির পাশাপাশি ভাগ্যের ওপরও কিছুটা ভরসা রাখতে চাইছে ভারত।
তাদের লক্ষ্য পরিষ্কার—২০০৭ ও ২০২৪ সালের পর টি২০ বিশ্বকাপে তৃতীয় শিরোপা ধরে রাখা।
অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের লক্ষ্য একেবারেই আলাদা। তারা চায় এই বিশাল স্টেডিয়ামের গর্জন থামিয়ে দিতে।
কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার খুব শান্তভাবেই বলেছেন—
“আমরা অন্তত একবার ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে চাই। যদি সেটা করতে গিয়ে কয়েকটা ভারতীয় হৃদয় ভাঙতে হয়, তাতেও আমাদের আপত্তি নেই।”
তার এই কথায় বোঝা যায়, চাপকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের খেলায় মন দিতে চায় নিউজিল্যান্ড।
টি২০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারত ও নিউজিল্যান্ড তিনবার মুখোমুখি হয়েছে, আর অবাক করা বিষয় হলো—এই তিন ম্যাচের একটিতেও ভারত জিততে পারেনি।
তবে নিউজিল্যান্ডেরও একটি হতাশাজনক রেকর্ড আছে। গত ১১ বছরে সাদা বলে চারবার ফাইনালে উঠেও একবারও শিরোপা জিততে পারেনি তারা।
এমনকি গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালেও ভারতের কাছে হেরেছিল কিউইরা।
তবুও স্যান্টনার এসব পরিসংখ্যান নিয়ে ভাবতে নারাজ।
তিনি বলেন,
“সবাই জানে আমরা হয়তো ফাইনালের ফেভারিট নই। কিন্তু এতে আমাদের কিছু যায় আসে না। দল হিসেবে ভালো খেলতে পারলে আমরা ট্রফি জিততেই পারি।”
ভারতের দল নির্বাচন নিয়েও কিছু আলোচনা চলছে।
শোনা যাচ্ছে, অভিষেক শর্মার বদলে একাদশে জায়গা পেতে পারেন রিঙ্কু সিং। একইভাবে স্পিন বিভাগে বরুণ চক্রবর্তীর জায়গায় কুলদীপ যাদবকে খেলানোর সম্ভাবনাও আছে।
যদি অভিষেক শর্মা খেলেন, তাহলে তাকে থামাতে প্রস্তুত নিউজিল্যান্ডের অফ স্পিনার গ্লেন ফিলিপস।
সঞ্জু স্যামসনের জন্য অপেক্ষা করছে ম্যাট হেনরির সুইং, আর ঈশান কিষানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেন লকি ফার্গুসন।
দুই দলের ব্যাটিং স্টাইল অনেকটাই মিল আছে—বিশেষ করে পাওয়ার প্লেতে।
এই টুর্নামেন্টে প্রথম ছয় ওভারে ভারত করেছে ৫৮ থেকে ৬৫ রান, যেখানে নিউজিল্যান্ড তুলেছে ৪৮ থেকে ৫৫ রান।
ছক্কা হাঁকানোর তালিকায়ও ভারতের আধিপত্য স্পষ্ট। টুর্নামেন্টের সেরা পাঁচে থাকা ছক্কাবাজদের মধ্যে তিনজনই ভারতীয়।
বাউন্ডারি মারার হারেও ভারত এগিয়ে। তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ৫.৪ বলে একটি বাউন্ডারি, আর নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে ৬.৩ বলে একটি।
তবে পরিসংখ্যান সব সময় ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে না। যেমন সেমিফাইনালে ইডেনে ফিন অ্যালেন যে আগ্রাসী ব্যাটিং করেছিলেন, সেটি যদি আবার দেখা যায়, তাহলে সব হিসাবই বদলে যেতে পারে।
কিউইদের ব্যাটিং লাইনে এখনো বড় ইনিংস খেলেননি ড্যারেল মিচেল। ফাইনালে তার কাছ থেকে বড় কিছু আশা করছে দল।
তার পাশাপাশি আছে ডেভন কনওয়ে, রাচিন রবীন্দ্র, মার্ক চ্যাপম্যান ও গ্লেন ফিলিপস—যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে।
অধিনায়ক স্যান্টনারও অলরাউন্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ প্রায় নয় নম্বর পর্যন্ত গভীর।
মিডল অর্ডারে সূর্যকুমার যাদব, শিভম দুবে ও হার্দিক পান্ডিয়ার ওপর অনেকটা নির্ভর করছে দল।
তবে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে জাসপ্রীত বুমরাহ।
বিশেষ করে ডেথ ওভারে তার করা শেষ ১২ বল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
দুই দলের শক্তিমত্তা প্রায় সমান। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—সব বিভাগেই রয়েছে ম্যাচ জেতানোর মতো খেলোয়াড়।
তবে ম্যাচের সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হতে পারে কয়েকটি মুহূর্তে।
যদি নিউজিল্যান্ড শুরুতেই ভারতের উইকেট তুলে নিতে পারে, তাহলে তারা ম্যাচে বড় সুবিধা পাবে।
আর যদি বুমরাহ তার ডেথ ওভারের নিখুঁত বোলিং বজায় রাখতে পারেন, তাহলে ভারতের ট্রফি ধরে রাখার স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তব হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে কিউইরা যদি সেই সময়টায় ভালোভাবে সামলাতে পারে, তাহলে শুধু কয়েকটি নয়—ভারতের কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়ও ভেঙে যেতে পারে।

