বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ২০২৫-২৬ সালের এই সময়কাল। যেখানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে বহু শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, সেখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এই বিপর্যয় কি প্রাকৃতিক নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফসল?
অনুসন্ধানী তথ্য এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার চিত্র।
উপদেষ্টা নিয়োগের নেপথ্য ও যোগ্যতার প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন নূরজাহান বেগমকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন, তখনই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। নূরজাহান বেগম গ্রামীণ ব্যাংকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হলেও- একটি দেশের জটিল স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিচালনার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা বিশেষায়িত জ্ঞান তার ছিল না।
মূলত ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত আস্থাভাজন এবং ‘গ্রামীণ’ বলয়ের দীর্ঘদিনের সহকর্মী হওয়াই কি তার প্রধান যোগ্যতা ছিল? এই প্রশ্নটি এখন জাতীয় তর্কে পরিণত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের বদলে একজন ব্যাংকারকে বসানোর সিদ্ধান্তটিই ছিল প্রথম ভুল ধাপ, যার মাশুল আজ নিষ্পাপ শিশুদের জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে।
ভুল সিদ্ধান্ত ও টিকার শূন্য ভাণ্ডার
নূরজাহান বেগমের মেয়াদে নেওয়া সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি (HPNSP) তথা ওপি (Operational Plan) ব্যবস্থা বাতিল বা অপরিকল্পিত সংস্কার করেছিলেন। স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের কেনাকাটা ও সরবরাহ প্রক্রিয়াকে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই নাড়াচাড়া করার ফলে টিকা আমদানির চেইনটি ভেঙে পড়ে।
যার ফলে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকেই দেশে বিসিজি, হাম ও রুবেলাসহ ১০টি জীবনরক্ষাকারী টিকার মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসে। যখন মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মীরা সংকটের কথা জানান দিচ্ছিলেন, তখন মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা ছিলেন উদাসীন। টিকার মজুদ প্রায় শূন্যে নেমে আসার পরও জরুরি আমদানির কোনো ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ না নিয়ে বরং প্রশাসনিক জটিলতা ও দাপ্তরিক ফাইলে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে।
অতীতের দায় ও বর্তমানের ক্ষত: ড. ইউনূস ও নূরজাহান বেগমের যৌথ ব্যর্থতা
এই শিশুদের মৃত্যুর মিছিলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম কেউই কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের কর্মক্ষমতা তদারকি করা, কিন্তু তিনি কখনও কোনো কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেননি। বর্তমান যার ফলে জীবনের কাছে হার মানছে নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ।
অন্যদিকে, নূরজাহান বেগম জনস্বাস্থ্যের মতো একটি স্পর্শকাতর ও বিশেষায়িত জায়গায় ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে কাজ করতে গিয়ে গোটা স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজস্ব প্রশাসনিক জেদ বজায় রাখায় জাতীয় টিকাদানের হার (EPI Coverage) ৯০% থেকে নেমে অর্ধেকের কাছাকাছি চলে আসে, যা মূলত এই ভয়াবহ মড়কের পথ প্রশস্ত করেছিল। অভিজ্ঞতাহীন একজন ব্যক্তিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো জটিল জায়গায় বসানোর যে চড়া মাশুল আজ শিশুদের প্রাণ দিয়ে দিতে হচ্ছে, এই পরিস্থিতির দায়ভার সরাসরি সাবেক এই দুই উপদেষ্টার ওপরই বর্তায়।
ইতিহাসের কাঠগড়ায় প্রশাসনিক অবহেলা
বর্তমানে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও অতীতের এই প্রশাসনিক অবহেলাকে স্রেফ ‘অতীত’ বলে মুছে ফেলার সুযোগ নেই। একটি রাষ্ট্রের প্রধান কাজ তার নাগরিকদের, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু যখন ভুল নীতি ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে টিকা না পেয়ে শিশুরা মারা যায়, তখন সেটি আর সাধারণ মৃত্যু থাকে না, বরং তা ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের’ নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের প্রশ্ন তুলেছেন যে, জনস্বাস্থ্য খাতে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ড. ইউনূস নূরজাহান বেগমকে কোন যোগ্যতায় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে এইচপিএনএসপি (HPNSP) বা ওপি-ব্যবস্থা অপরিকল্পিতভাবে বাতিল করায় দেশে টিকা সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে হামসহ বিভিন্ন রোগে অনেক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য তিনি ড. ইউনূস এবং নূরজাহান বেগম উভয়কেই জবাবদিহির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের প্রশ্ন তুলেছেন, জনস্বাস্থ্য খাতে অভিজ্ঞতা না থাকা নূরজাহান বেগমকে কোন যোগ্যতায় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে ওপি-ব্যবস্থা বাতিল করায় টিকা সংকটে দেশে হামের প্রকোপে বহু (৪১ থেকে ১০০-র বেশি) শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই বিপর্যয়ের জন্য তিনি ড. ইউনূস ও নূরজাহান বেগম উভয়কেই সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
জুলকারনাইন সায়েরের তোলা জবাবদিহির দাবিটি আজ কেবল একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন নয়, বরং সন্তানহারা হাজারো বাবা-মায়ের প্রাণের দাবি।
ড. ইউনূসের বিদায়ী প্রশাসন যদি নিজেদের স্বচ্ছ দাবি করে থাকে, তবে এই শিশু মৃত্যুর বিপর্যয়ের জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে নূরজাহান বেগমের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং প্রধান উপদেষ্টার তদারকির চরম ব্যর্থতাকে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ইতিহাসে এই সময়টি কেবল একটি টিকা সংকটের গল্প হিসেবে নয়, বরং ‘ভুল মানুষের হাতে ভুল দায়িত্ব’ তুলে দেওয়ার করুণ পরিণতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে লেখা থাকবে।

