জীবনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকা শুধু মানসিক প্রশান্তির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার সক্ষমতা ধরে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চমকপ্রদ তথ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের জীবনে উদ্দেশ্যবোধ বেশি, তাঁদের মধ্যে জ্ঞানীয় সক্ষমতার ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য ও মস্তিষ্কের সুস্থতার মধ্যে থাকতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের (ইউসি ডেভিস) গবেষকেরা এ তথ্য জানিয়েছেন। গবেষণাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক মর্যাদাপূর্ণ পিয়ার-রিভিউড জার্নাল The American Journal of Geriatric Psychiatry-তে প্রকাশিত হয়। একই বছরের ২৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটেও গবেষণার ফলাফল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
এই বিস্তৃত গবেষণায় ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৩ হাজার ৭৬৫ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁদের সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞানীয় সক্ষমতা স্বাভাবিক ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার সক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে উঠে আসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি তথ্য। পর্যবেক্ষণকালে ১ হাজার ৮২০ জনের মধ্যে জ্ঞানীয় সক্ষমতার ঘাটতি দেখা দেয়। তবে যাঁদের জীবনে উদ্দেশ্যবোধ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা দেখা দেওয়ার আপেক্ষিক ঝুঁকি প্রায় ২৮ শতাংশ কম পাওয়া যায়। মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে গবেষণায় এই ফলাফল নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিষণ্নতার উপসর্গ ও জাতিগত পরিচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক বজায় ছিল। এমনকি আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত APOE4 জিনের তথ্য পাওয়া অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও একই ধরনের সম্পর্ক শনাক্ত করেন গবেষকেরা। বিষয়টি গবেষণার ফলাফলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
জীবনের উদ্দেশ্য বলতে আসলে কী বোঝায়?
জীবনের উদ্দেশ্য মানেই কি বড় কোনো স্বপ্ন, অসাধারণ অর্জন কিংবা বিপুল সাফল্যের পেছনে ছুটে চলা? গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিষয়টি মোটেও শুধু এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গবেষকদের মতে, জীবনের উদ্দেশ্যবোধ হলো নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে করা এবং সেই অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত লক্ষ্য বা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলা। পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক চর্চা, নতুন কিছু শেখা কিংবা ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা থেকে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে পারেন। অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্য সব সময় বিশাল কিছু হতে হবে, এমন নয়। ছোট ছোট অর্থপূর্ণ কাজও মানুষের জীবনে গভীর তাৎপর্য বহন করতে পারে।
তবে গবেষণায় এসব কার্যক্রমের কোনটি সবচেয়ে বেশি উপকারী, তা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক এবং ইউসি ডেভিসের মনোরোগ ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আলিজা উইঙ্গোর মতে, জীবনে উদ্দেশ্যবোধ থাকা বয়সজনিত পরিবর্তনের মুখে মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। এমনকি আলঝেইমারের জিনগত ঝুঁকি রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও উদ্দেশ্যবোধের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ভালো জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে চলমান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে এটি একটি আশাব্যঞ্জক পর্যবেক্ষণ।
গবেষণায় আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উঠে এসেছে। যাঁদের জীবনে উদ্দেশ্যবোধ বেশি, তাঁদের মধ্যে জ্ঞানীয় সক্ষমতার ঘাটতি শুরু হওয়ার সময় তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়েছে। তবে এই পার্থক্য ছিল গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৪ মাস। সময়ের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও গবেষণাটি জীবনের উদ্দেশ্যবোধ ও জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
অবশ্য গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, জীবনের উদ্দেশ্যবোধের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এর মাধ্যমে সরাসরি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব- এমনটি এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। কারণ গবেষণাটি ছিল পর্যবেক্ষণমূলক। অর্থাৎ গবেষণায় দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও একটি বিষয় সরাসরি অন্যটির কারণ, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
জীবনে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকা শুধু ব্যক্তিগত সফলতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, মানসিক সুস্থতা ও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কোনো না কোনো অর্থপূর্ণ লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলার গুরুত্ব তাই নতুন করে সামনে এসেছে। এ প্রসঙ্গে একটি অনুপ্রেরণামূলক উপদেশ মনে করিয়ে দেওয়া যায়- “লক্ষ্য স্থির করো, আর সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাও। যত বাধাই আসুক, কখনো হাল ছেড়ো না।”
তবু গবেষণার ফলাফল বয়সজনিত জ্ঞানীয় সমস্যা প্রতিরোধে মানসিক সুস্থতা ও জীবনের অর্থপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে জীবনের উদ্দেশ্যবোধ বাড়ানোর উদ্যোগ সত্যিই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে কি না, তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই গবেষণা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে- জীবনে আমরা কী অর্জন করতে চাই, তার পাশাপাশি কেন বেঁচে আছি এবং প্রতিদিনের কাজের মধ্যে কতটা অর্থ খুঁজে পাই, সেটিও কি সুস্থভাবে বয়স বাড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ? বিজ্ঞানীরা এখন সেই সম্পর্কে আরও গভীরভাবে গবেষণা করা উচিত।

