বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি রোগীর সংখ্যা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিনের কাশি ও ফুসফুসজনিত নানা জটিলতা নিয়ে রোগীর চাপ স্পষ্টভাবে বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই রোগীদের বড় একটি অংশই সিওপিডিতে আক্রান্ত।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিওপিডি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ পরিবেশদূষণ। বিশেষ করে বায়ুদূষণ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। নগরায়ন ও শিল্পায়নের বিস্তার, যানবাহনের ধোঁয়া এবং অবকাঠামো নির্মাণকাজ থেকে ছড়ানো ধুলাবালি বাতাসকে দিন দিন আরো দূষিত করছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নগর ও শিল্পাঞ্চলের মানুষের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। একপর্যায়ে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। শুধু বায়ুদূষণ নয়, রান্নার সময় কঠিন জ্বালানি ব্যবহার, ধূমপান এবং কর্মক্ষেত্রে ধুলাবালির সংস্পর্শও সিওপিডির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এখনো কাঠ, খড় ও গোবর দিয়ে রান্নার প্রবণতা থাকায় নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্পকারখানায় কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের ধোঁয়া কমানো এবং নির্মাণকাজজনিত ধুলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে বলে সতর্ক করছেন তারা। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এ কে এম ফাহমিদ নোমান বণিক বার্তাকে বলেন, সিওপিডি হলো ফুসফুসের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এতে শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা তৈরি হয়। রোগটির প্রধান লক্ষণ শ্বাসকষ্ট, কফসহ দীর্ঘস্থায়ী কাশি, বুকে চাপ এবং শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ। মৃত্যুর কারণ হিসেবে সিওপিডি বর্তমানে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এর মূল কারণ বায়ুদূষণ। পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান এবং ফুসফুসের সংক্রমণও এ রোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সিওপিডি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর এ রোগ দেখা দেয়। সিওপিডি কখনো পুরোপুরি ভালো হয় না। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর উপসর্গ যেমন শ্বাসকষ্ট ও কাশি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও ফুসফুসের ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা সবচেয়ে কার্যকর।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ দুই হাসপাতালের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিওপিডি রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে এ দুটি হাসপাতালে সিওপিডিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫৬। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ১২০-এ। ২০২৩ সালে রোগীর সংখ্যা হয় ৫ হাজার ৩১৭। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৫ হাজার ৬৮৮ এবং ২০২৫ সালে সর্বশেষ এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯২০-এ।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, বায়ুদূষণের কারণে সারা বিশ্বেই সিওপিডি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর পাশাপাশি নগরায়ন, গাছপালা কমে যাওয়া, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান এবং গাড়ির কালো ধোঁয়াও বড় কারণ। তিনি বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাসের জন্য যে মানসম্মত পরিবেশ প্রয়োজন, তা দেশে নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। ফুসফুস আক্রান্ত হলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সিওপিডি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিওপিডি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছে। শুধু ২০২১ সালেই বিশ্বজুড়ে ৩৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে সিওপিডির কারণে। যা মোট বৈশ্বিক মৃত্যুর প্রায় ৫ শতাংশ। এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটে এসব দেশে। মোট আক্রান্তের প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী বায়ুদূষণ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান। দক্ষিণ এশিয়ায় গড় আক্রান্তের হার ১১ দশমিক ১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এ হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মোহাম্মেদ আবদুল্লাহ আল মেহেদি বণিক বার্তাকে বলেন, সিওপিডি বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ নিঃসন্দেহে বায়ুদূষণ। তবে এ রোগ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার অভাবও বড় সমস্যা। ফলে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এখনো শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যান্য অসংক্রামক রোগের মতো সিওপিডি নিয়েও ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি প্রয়োজন। পরিবেশদূষণ কমানোর পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে মানুষকে সচেতন করলেই এ রোগের জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

