চলতি বছরে দেশে প্রথমবারের মতো নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী এক নারী গত ২৮ জানুয়ারি মারা যান। মৃত্যুর পর তার দেহে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে, যা নতুন করে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধিমালা (আইএইচআর)–এর জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিভাগে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত একজন নিশ্চিত রোগীর তথ্য ডব্লিউএইচওকে অবহিত করে। এর আগে ২৯ জানুয়ারি পরীক্ষাগারে ওই নারীর শরীরে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত হয়।
ডব্লিউএইচওর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত ওই নারীর কোনো ভ্রমণ ইতিহাস ছিল না। তবে তিনি নিয়মিত কাঁচা খেজুরের রস পান করতেন। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে একাধিকবার তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান করেন বলে জানা গেছে—যা বাংলাদেশে নিপাহ সংক্রমণের একটি পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)–এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানিয়েছেন, আক্রান্ত নারীর সংস্পর্শে আসা মোট ৩৫ জনকে শনাক্ত করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের সবার পরীক্ষার ফল নিপাহ ভাইরাসের জন্য নেগেটিভ এসেছে এবং নতুন কোনো সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই নারীর মৃত্যুর পর আইইডিসিআর তার নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তী পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, তার মৃত্যু নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের কারণেই হয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত বছরের আগস্টের পর এটিই দেশে নিপাহ ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালে এই ভাইরাসে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছিল।
আইইডিসিআর জানায়, ওই নারী প্রথম ২১ জানুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরুতে তার জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে টান, ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা ও বমির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, বিভ্রান্তি এবং খিঁচুনির মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়, যা নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশে মোট ৩৪৮ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা প্রায় ৭২ শতাংশ মৃত্যুহারের ইঙ্গিত দেয়—বিশ্বের যেকোনো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আইইডিসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দেশে পাঁচজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং দুঃখজনকভাবে তাদের সবাই মারা যান। আর ২০২৩ সালে ১৩ জন এই ভাইরাসে সংক্রমিত হন, যাদের মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ বারবার সতর্ক করে আসছে যে, কাঁচা খেজুরের রস নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবু প্রতি বছর শীত মৌসুমে এই ঝুঁকি উপেক্ষা করেই অনেক মানুষ কাঁচা রস পান করছেন, যার পরিণতি কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
চলতি বছরের এই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—নিপাহ ভাইরাস এখনো বাংলাদেশে একটি বাস্তব ও গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, যার বিরুদ্ধে সচেতনতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

