মাত্র তিন বছর বয়সী জুরাইজ সাদমান ভুল করে ত্বকে লাগানোর অ্যালার্জির ওষুধ খেয়ে ফেলে। আতঙ্কিত পরিবার দ্রুত তাকে বাড়ির কাছের কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু ‘পুলিশ কেস’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বেসরকারি হাসপাতালটি কোনো চিকিৎসা না দিয়েই তাকে সরকারি হাসপাতালে রেফার করে।
সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। কিন্তু সেখানে বলা হয়, গ্যাস্ট্রিক ল্যাভাজ (পেট ধোয়ার) সুবিধা নেই। শেষ পর্যন্ত পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডিএমসিএইচ)।
জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর তার পাকস্থলী ধোয়া হয় এবং শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসা নিতে হয়েছে মেঝেতে শুয়ে—টানা দুই দিন।
সাদমানের মতো বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত বহু রোগী বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন না। কারণ এগুলোকে ‘পুলিশ কেস’ ধরা হয়। ফলে তাদের শেষ আশ্রয় ঢাকা মেডিকেল।
ঢাকা মেডিকেল কাউকে ফিরিয়ে দেয় না—এটাই স্বস্তি। কিন্তু সেখানে জায়গার সংকট এতটাই তীব্র যে অধিকাংশ রোগীকেই চিকিৎসা নিতে হয় মেঝেতে। চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকিও।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) শিশু মেডিসিন ওয়ার্ড নম্বর ১০৮-এ গিয়ে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। ১৯ বেডের এই ওয়ার্ডে সোমবার সকালে ভর্তি ছিল ১০১ জন রোগী।
৮ নম্বর বেডে পাশাপাশি শুয়ে আছে তিন শিশু—একজন ছয় মাস, একজন দুই মাস, আরেকজন এক বছর বয়সী। কারও হাতে স্যালাইন, কারও শরীরে ক্যানুলা। প্রায় প্রতিটি বেডেই দুই বা তিনজন শিশু।
বিছানার সামনে মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে আছে আরও চার শিশু। কেউ স্যালাইন নিচ্ছে, কেউ মায়ের কোলে মাথা রেখে চিকিৎসা নিচ্ছে। নার্সরা ইনজেকশন দিচ্ছেন, চিকিৎসকরা রিপোর্ট দেখছেন, আর স্বজনরা দৌড়াচ্ছেন ওষুধ আর কাগজপত্র নিয়ে।
একই চিত্র শিশু ক্যানসার ও শিশু সার্জারি ওয়ার্ডেও—যেখানে রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ।
কেরানীগঞ্জের ছয় মাস বয়সী সাফায়েত চার দিন আগে মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে। ১৪ বেডের ওয়ার্ডে বুধবার ভর্তি ছিল ৬২ জন রোগী। সাফায়েত মেঝেতে শুয়ে স্যালাইন নিচ্ছে।
জামালপুরের দুই মাস বয়সী সাদিয়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। মায়ের কোলে শুয়ে মেঝেতেই চলছে তার চিকিৎসা।
নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে আনা ছয় মাসের সাদিকা উচ্চ জ্বর থেকে মস্তিষ্কে সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। প্রথমে রংপুর মেডিকেল, পরে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। ২০৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১৪ বেডের বিপরীতে প্রায় ৭০ রোগী ভর্তি। সাদিকা অর্ধেক বেড পেয়েছে, মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা বা মা।
ওয়ার্ড ২০৮-এর ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স আশরাফুন্নেসা বলেন, “সকালের শিফটে আমরা আটজন নার্স, কিন্তু রোগী ১০১ জন। প্রতিটি বেডে দুই-তিনজন করে রোগী। মেঝেতেও রোগী। কারও অবস্থা খারাপ হলে সাময়িকভাবে বেডে তুলি, পরে আবার মেঝেতে দিতে হয়। অক্সিজেন আর সাকশন মেশিন আছে, কিন্তু চাপের কারণে বেশিরভাগ রোগীকেই মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হয়।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন নেছা বলেন, “হাসপাতাল যখন নির্মিত হয়েছিল, নির্দিষ্ট সংখ্যক বেড ছিল। সেই সংখ্যা আজও একই আছে। কিন্তু জনসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বেড বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।”
শিশু বহির্বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাহেদুর রহমান জানান, প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী দেখা হয়। কখনও ৭০০-ও এসেছে। প্রতিদিন ৩৫-৪০ জনকে ভর্তি করতে হয়। অথচ শিশু ওয়ার্ডে বরাদ্দ ৬০ বেড, সেখানে ভর্তি থাকে ২৫০ জনের বেশি।
“মেঝেতে ভর্তি মানেই সংক্রমণের ঝুঁকি। এক রোগ নিয়ে এসে আরেক রোগ নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাধ্য হয়ে কেবল গুরুতর রোগীদেরই ভর্তি করি,” বলেন তিনি।
পাঁচজন চিকিৎসক ছয় ঘণ্টায় ৪০০-এর বেশি রোগী দেখেন। অর্থাৎ একজন চিকিৎসককে ১০০-এর বেশি রোগী সামলাতে হয়। এতে প্রত্যেক রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা মেডিকেলের শিশু এনআইসিইউতে ৪০টি বেড রয়েছে। প্রতিদিন তিন-চারটি বেড খালি হলেও অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকে অন্তত ২০০ রোগী।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, চাপ শুধু শিশু বিভাগে নয়—সব বিভাগেই। ২,৬০০ বেডের হাসপাতালে প্রতিদিন ৪,০০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অতিরিক্ত রোগীরা চিকিৎসা নেয় মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়িতে।
আগের সরকারের ৫,০০০ বেডের মেগা প্রকল্প বাতিল হওয়ার পর নতুন করে ৪,০০০ বেডের সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে তিনি বলেন, “শুধু ভবন বাড়ালেই হবে না। ঢাকা মেডিকেলের ওপর চাপ কমাতে অন্য হাসপাতালের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে, যাতে ছোটখাটো জটিলতায় রোগীদের এখানে পাঠাতে না হয়।”

