ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) জুড়ে ‘ক্যানডিডা অরিস’ বা ‘সি অরিস’ নামের এক ধরনের ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাকের বিস্তার নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসায় সহজে সারে না এমন এই ফাঙ্গাসকে ‘সুপারবাগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের প্রেক্ষাপটে এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ–এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগে যেখানে এই ছত্রাক মূলত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-এ সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমানে তা রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি উভয় তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালের আইসিইউতে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ সাময়িকীতে। ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি টারশিয়ারি হাসপাতালে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে সহযোগিতা করে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কারিগরি সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। গবেষণায় মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

গবেষকদের ভাষ্য, নমুনাগুলো কয়েক বছর আগের হলেও বর্তমানে সংক্রমণের বিস্তার আরও বেড়েছে। নিয়মিত পরীক্ষা করলে নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার প্রমাণ মিলছে।
হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে সংক্রমণ:
গবেষণার অংশ হিসেবে রোগীদের ভর্তির পরপরই এবং আইসিইউতে অবস্থানকালে ত্বক ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ‘ভিটেক-২’ সিস্টেমের মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, আইসিইউ রোগীদের প্রায় ৭ শতাংশের শরীরে কোনো না কোনো সময়ে ‘সি অরিস’ শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তির পর সংক্রমিত হয়েছেন, যা ইঙ্গিত করে যে সংক্রমণটি হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সংক্রমণ হারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও পাওয়া গেছে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ রোগীদের ১৩ শতাংশ এই ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হলেও বেসরকারি হাসপাতালে হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় এই হার অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, কানাডা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে এই সংক্রমণের হার সাধারণত ০.৫ শতাংশের নিচে।

আইইডিসিআর–এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষণার অন্যতম গবেষক ডা. জাকির হোসেন হাবিব বলেন, ক্যানডিডা শনাক্ত করা গেলেও সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা বেশ জটিল। তাঁর ভাষায়, সাধারণ ল্যাবরেটরিতে এটি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়; এর জন্য স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও মলিকুলার টেস্ট প্রয়োজন। দেশের কিছু মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে এ সুবিধা থাকলেও অনেক জায়গায় তা অনুপস্থিত। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় একটি নবজাতক ইউনিটে ক্যান্ডিডা কলোনাইজেশন এবং একজন রোগীর রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যা সক্রিয় সংক্রমণের প্রমাণ। পরবর্তী অনুসন্ধানে বিভিন্ন ওয়ার্ডেও এর উপস্থিতি মিলেছে। তাঁর মতে, আরও অনুসন্ধান চালালে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে যথাযথ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সমাধান হিসেবে তিনি আইপিসি ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করা, রোগী ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং হাত ধোয়া, জীবাণুমুক্তকরণ ও রোগী আলাদা রাখার মতো মৌলিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করলে বড় ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে সতর্ক থেকে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে মুমূর্ষু রোগীরা:
এই ফাঙ্গাস উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে বাস করতে পারে, তবে রক্তে প্রবেশ করলে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘সি অরিস’–এ আক্রান্ত রোগীদের আইসিইউতে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়েছে এবং ভেন্টিলেশন বা ক্যাথেটারের মতো যান্ত্রিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে।
ল্যাব পরীক্ষায় দেখা যায়, সি অরিসের সব নমুনাই ‘ফ্লুকোনাজোল’ প্রতিরোধী এবং একটি ছাড়া বাকি সব ‘ভোরিকোনাজোল’ প্রতিরোধী—যা প্রথম ও দ্বিতীয় সারির বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ।
আইসিডিডিআর,বি–এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ও গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, এই গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে ক্যান্ডিডা অরিস শুধু নবজাতক নয়, সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। হাসপাতালে এর বিস্তার এবং প্রচলিত ওষুধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
তিনি বলেন, সংক্রমণ প্রতিরোধ জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা এখন জরুরি।
নির্বাচিত নমুনার জেনেটিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ছত্রাক দক্ষিণ এশীয় ক্লেডের অন্তর্ভুক্ত। গবেষকদের মতে, এর অর্থ হলো এটি বাইরে থেকে আসা বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ নয়; বরং এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বিস্তার লাভ করেছে।
গবেষকরা হাসপাতালগুলোতে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্লোরিন-ভিত্তিক জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধোয়ার কঠোর অনুশীলন এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়মিত স্ক্রিনিং।
অবশিষ্ট অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধগুলোর কার্যকারিতা ধরে রাখতে সেগুলোর অত্যন্ত সতর্ক ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সমস্যার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে ঢাকার বাইরে সারা দেশের আরও বেশি সংখ্যক হাসপাতালে বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা।

