দেশের বিমা খাতে বড় ধরনের ব্যয়চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। বিমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়াম আয়ের ওপর আরোপিত নিবন্ধন নবায়ন মাশুল ধাপে ধাপে বহুগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইডিআরএর প্রস্তাব অনুযায়ী, চলতি সময়ে দেড় গুণ বাড়ার পর ২০২৮ সালে এই মাশুল আড়াই গুণ এবং ২০৩০ সালে পাঁচ গুণে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই মাশুল ‘নিবন্ধন নবায়ন মাশুল’ নামে পরিচিত। আইডিআরএর লাইসেন্স নিয়ে বর্তমানে দেশে ৩৫টি জীবনবিমা ও ৪৫টি সাধারণ বিমা বা নন-লাইফ কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে। নতুন হার কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানের সবাইকে বাড়তি মাশুল দিতে হবে।
আইডিআরএর প্রস্তাব বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আট মাস ধরে ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’ সংশোধনের কাজ করছে। বিভাগটি জানিয়েছে, শুরুতে নিবন্ধন নবায়ন মাশুল চার গুণ বাড়ানোর একটি খসড়া তৈরি করা হয়, যা ২০২৫ সালের ১ জুলাই চূড়ান্ত করা হয়। পরে বছরভিত্তিক হার নির্ধারণ করে খসড়ায় পরিবর্তন আনা হয়। গত মাসে সংশোধিত খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আইন মন্ত্রণালয় কোনো সংশোধন ছাড়াই গত সপ্তাহে তা ফেরত দিয়েছে। এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে পুনরায় পাঠানো হলেই নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক গতকাল রোববার বলেন, ভেটিং সম্পন্ন হয়েছে। তাই এখন প্রজ্ঞাপন জারির পথে আর কোনো বাধা নেই। চলতি সপ্তাহেই এটি জারি হতে পারে। তবে নতুন প্রজ্ঞাপন কবে থেকে কার্যকর হবে এবং ২০৩০ সালের নিবন্ধন নবায়ন মাশুলের হার এখনই নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমা মোবারেক আইডিআরএর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, ২০১২ সালে নিবন্ধন নবায়ন মাশুল ছিল মোট প্রিমিয়ামের প্রতি হাজারে ৩ দশমিক ৫ টাকা। পরে ২০১৮ সালের ১১ জুন তা সংশোধন করে প্রতি হাজারে ১ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এবার তিন ধাপে এই হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বিমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়ামের প্রতি হাজারে নিবন্ধন নবায়ন মাশুল হবে ২ দশমিক ৫ টাকা। ২০২৮ ও ২০২৯ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়াবে ৪ টাকায়। আর ২০৩০ সাল থেকে পরবর্তী সময়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি হাজারে ৫ টাকা।
আইডিআরএর নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো বিমা কোম্পানি ব্যবসা চালাতে পারে না। প্রতি বছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নবায়নের জন্য আবেদন ও মাশুল জমা দিতে হয়। আইডিআরএ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুমোদন দিলে তা পরবর্তী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। সংস্থাটির সূত্র জানায়, বেশির ভাগ বিমা কোম্পানি গত ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই মাশুল ও ভ্যাট জমা দিয়েছে। তবে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় এখনো নিবন্ধন নবায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে।
নতুন হার ঠিক কোন সাল থেকে কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে মাশুল আগের মতো ১ টাকা থাকবে, নাকি নতুন করে ২ দশমিক ৫ টাকা নির্ধারণ করা হবে—এ বিষয়েও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি। আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার বলেন, নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলেই এখনো কোনো কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন করা হয়নি।
আইডিআরএর এই সিদ্ধান্তে বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে কেউই প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। একটি জীবনবিমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে বিমা খাত এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নেই। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে নিবন্ধন নবায়নের মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, নতুন হার এ বছর নয়, অন্তত ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা যেত।

