বিমা খাতে অনিয়ম ও জালিয়াতি প্রতিহত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রথমবারের মতো বিমা কোম্পানির নথি তল্লাশি ও সম্পদ জব্দ করার ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। সংশোধিত বীমা আইন, ২০১০-এর খসড়া ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
খসড়া অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়ম, জাল দাবি, বেআইনি কমিশন বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে আইডিআরএ সরাসরি অনুসন্ধান চালাতে পারবে। চেয়ারম্যানের অনুমোদনে কর্মকর্তারা ভবনে প্রবেশ, লকার বা আলমারি ভেঙে প্রয়োজনীয় নথি জব্দ, অনুলিপি তৈরি এবং পুলিশের সহায়তা নিতে পারবেন। পুলিশি সহায়তা বাধ্যতামূলক হবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালে কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দিলে, তথ্য গোপন করলে বা সহযোগিতা না করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সরাসরি জব্দ সম্ভব না হলে নথি স্থানান্তর, বিক্রি বা ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হবে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শপথের অধীনে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে, যা আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।
আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে, জব্দ করা নথি সাধারণত ১৮০ দিনের বেশি রাখা যাবে না। তদন্ত শেষ হলে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে তা ফেরত দিতে হবে। নথি বা সম্পদ জব্দ হওয়া ব্যক্তির জন্য সরকারের কাছে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার এড়ানো যায়।
সংশোধনীতে আরও বলা হয়েছে, বিমা কোম্পানির অর্থায়নে গঠিত বা পরিচালিত যেকোনো প্রতিষ্ঠান, ফাউন্ডেশন বা সহযোগী সংস্থা আইডিআরএর তদারকির আওতায় আসবে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন চালিয়ে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের বিশেষ ক্ষমতাও আইডিআরএ পাবে, যা অন্য সরকারি সংস্থার সহায়তায় করা সম্ভব।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান ড. আসলাম আলম জানিয়েছেন, খসড়া আইনের ওপর আলোচনা শেষ হয়েছে এবং এখন মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, “সংস্কারের মূল লক্ষ্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।”
তবে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা নিয়ে সংশয়ও আছে। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এস এম নূরুজ্জামান বলেন, “জব্দের ক্ষমতা নিয়ে আরও পর্যালোচনা দরকার। তড়িঘড়ি না করাই ভালো।” সাবেক সিইও এস এম জিয়াউল হক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, “ক্ষমতা অপব্যবহারে এটি ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার হতে পারে।”
অন্যদিকে বিমা গ্রাহক সাজ্জাদুল ইসলাম মনে করেন, “দাবি আদায়ে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। নিয়ন্ত্রক শক্ত হলে ভোগান্তি কমবে।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধান ও জব্দের ক্ষমতা প্রয়োগে স্পষ্ট গাইডলাইন, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা শেখ বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা শক্ত হওয়া প্রয়োজন, তবে সৎ ও ন্যায়সংগত প্রয়োগই মূল চ্যালেঞ্জ।”

