প্রতিবছরের মতো এবারও ডিসেম্বর মাসে দেশের সব বিমা কোম্পানিকে তাদের নিবন্ধন নবায়ন করতে হতো। কোম্পানিগুলো সময়মতো নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে আবেদন করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এখনও কাউকে নবায়ন সনদ দেয়নি। এতে করে আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে সব কোম্পানি কার্যত ‘নবায়নবিহীন’ অবস্থায় ব্যবসা চালাচ্ছে।
আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ বা দাবি নিষ্পত্তি করতে পারবে না। তবে বাস্তবে দেশের সব জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানি স্বাভাবিকভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। খাতের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এই পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম ‘অবৈধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম বলেন, “নিবন্ধন নবায়ন না হওয়ায় কোম্পানিগুলোর কোনো দোষ নেই। কিন্তু এটি আমাদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর, বিশেষ করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রুপ বিমা করার সময় সমস্যা দেখা দেয়। তারা নবায়ন সনদের উপস্থিতি চাই।”
খাতসংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, সাধারণত প্রতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলো নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে নবায়নের আবেদন করে। আইডিআরএ সাধারণত ডিসেম্বর মাসের মধ্যে নবায়ন সনদ প্রদান করে থাকে। কিন্তু এবার ফেব্রুয়ারি মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সনদ দেয়নি। এতে কোম্পানিগুলো স্বাভাবিক ব্যবসা চালাচ্ছে, কিন্তু আইনি অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। আইডিআরএ এই বিষয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি। তবে খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেরি দেশের বিমা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করা কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য করার জন্য দুই মাস ধরে তাদের নবায়ন অনুমোদন দিচ্ছে না। আইডিআরএ’র সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করেন। এর ফলে দেশের সব বিমা কোম্পানি কার্যত ‘অবৈধ’ অবস্থায় চলে গেছে।
ফেব্রুয়ারির গেজেট প্রকাশিত হলেও কোম্পানিগুলো নভেম্বর মাসে আগের নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করেছিল। আইডিআরএ পরে নির্দেশ দেয়, নবায়ন পেতে কোম্পানিগুলোকে নতুন ফি পরিশোধ করতে হবে। এই নিয়ে আইডিআরএ’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, “নিবন্ধন নবায়নের কাজ চলমান। গেজেট প্রকাশিত হওয়ার কারণে কোম্পানিগুলোকে সংশোধিত ফি দিতে হবে। আবেদন বাতিল না হলে তারা ব্যবসা চালাতে পারবে।”
১ মার্চ আইডিআরএ কোম্পানিগুলোকে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছে, ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’ এর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। এ অনুযায়ী ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের জন্য অবশিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে। নতুন ফি অনুযায়ী, ২০২৬–২০২৮ সালে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা ধার্য করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এক কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয়ের ক্ষেত্রে পরবর্তী বছরের নবায়ন ফি হবে ২৫ হাজার টাকা। ২০২৯–২০৩১ সালে ফি বাড়িয়ে প্রতি হাজারে ৪ টাকা, ২০৩২ সাল ও পরবর্তী বছরে ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে হার ছিল প্রতি হাজারে ১ টাকা।
বর্তমান হার ০.১% থেকে চূড়ান্তভাবে ০.৫% পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি হাজারে অতিরিক্ত ৪ টাকা বা ০.৪% খরচ বহন করতে হবে কোম্পানিগুলোকে। প্রথম ধাপেই (২.৫০ টাকা) প্রতি হাজারে ১.৫০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। এই ফি বৃদ্ধি এমন সময়ে হয়েছে যখন দেশের বিমা খাতে গ্রাহক আস্থা কম, দাবি পরিশোধ বিলম্বিত এবং বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে বাজারে আলোচনা চলছে। ফলে মার্কেট সম্প্রসারণ ও গ্রাহক সুরক্ষা জোরদারের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত খাতের জন্য মিশ্র বার্তা হিসেবে ধরা পড়তে পারে।
একজন অভ্যন্তরীণ সিইও, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কিন্তু অতিরিক্ত ফি আদায়ের জন্য আইডিআরএ সব কোম্পানিকে দুই মাস ধরে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাতে বাধ্য করছে।” তিনি আরও বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, অথচ আমরা নভেম্বরেই আবেদন করেছি। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফি বাড়িয়ে আর্থিক চাপ তৈরি করছে। এই ধরনের কার্যক্রম খাতের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। নতুন ফি বৃদ্ধির কারণে মূলত গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। লভ্যাংশ কমে যাবে, দাবির টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারবে না। এতে বিমার প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।”
যোগাযোগ করা হলে প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম বলেন, “নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ বা দাবি নিষ্পত্তি করতে পারবে না। এখন দেশের সব বিমা কোম্পানি কার্যত অবৈধ। তবে এখানে কোম্পানিগুলোর কোনো দোষ নেই। কোম্পানিগুলো নভেম্বরেই সময়মতো নবায়নের জন্য আবেদন করেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ এখনো অনুমোদন দেয়নি।”
অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানো ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি করবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আইডিআরএ সাধারণত ডিসেম্বরের মধ্যে নবায়ন সনদ দেয় এবং এক বছরের জন্য নবায়ন অনুমোদন করে। আমরা আশা করি আইডিআরএ ২০২৬ সালের পুরো সময়ের জন্য নবায়ন অনুমোদন দেবে। একবার অনুমোদন দিলে কোনো জটিলতা হবে না।” তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রুপ বিমা কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। জালালুল আজিম জানান, “বিদেশি কোম্পানিগুলো গ্রুপ বিমা করার সময় নিবন্ধন নবায়ন সনদ দেখতে চায়। এখন কোনো কোম্পানির সনদ নেই, তাই সমস্যা তো হচ্ছেই।”
নবায়ন ফি বাড়ানো হলে পুনরায় আবেদন করা হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা নভেম্বরেই আবেদন করেছি। ফেব্রুয়ারিতে ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ হয়েছে। আমাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে নির্দেশ এসেছে, অতিরিক্ত ফি দেওয়া হবে না। এখন দেখব পরিস্থিতি কেমন হয়।”
নবায়ন ফি বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, “ফি বাড়লে কোম্পানির ব্যয় বাড়বে। ফলে বিমা গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ কমে যাবে। ইতিমধ্যেই কিছু কোম্পানি দাবির টাকা ঠিকমতো দিতে পারছে না। এখন বেনিফিট কমলে মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।”
আইডিআরএ’র পরামর্শক ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানান, “নিবন্ধন নবায়ন না থাকলে কোম্পানি ‘অবৈধ’ হবে কেন? এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোম্পানিগুলো আবেদন করেছে। তাই আবেদন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তারা ব্যবসা চালাতে পারবে। যেহেতু ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, কোম্পানিগুলোকে সংশোধিত হারেই ফি দিতে হবে।”

