মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহে বিশ্ববাজারে তেল সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেলের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি পেট্রল ও ডিজেলের বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল সংস্থা এএএ জানাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পেট্রলের দাম বেড়েছে ৬৫ সেন্ট এবং ডিজেলের দাম ১.১৩ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
যদিও আগের দশকের তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তেলের মূল্য বৃদ্ধি থেকে কম ঝুঁকিপূর্ণ। স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেওয়ার ক্ষমতাও বেড়েছে। তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় দেশ হওয়ায় মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি এবং পশ্চিম টেক্সাসের মতো অঞ্চল উচ্চ দামের সুফল পেতে পারে।
তবে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পরিস্থিতি ভিন্ন। জাহাজ চলাচলে জট, অবকাঠামো ক্ষতি এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন থাকলে দেশীয় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বেড়ে যাবে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কার্লাইলের বৈশ্বিক গবেষণা ও বিনিয়োগ কৌশল বিভাগের প্রধান জেসন থমাস বলেন, “সবার নজর এখন হরমুজ প্রণালির দিকে।”
হরমুজ প্রণালির ওপর সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে পরোক্ষভাবে বড় ধাক্কা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির প্রবৃদ্ধি ধীরে হলেও কমতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংঘাত তেলের বাজার ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় বিমান, কৃষি ও গাড়িশিল্পে ঝুঁকি
তেলের মূল্য বাড়লে সবচেয়ে দ্রুত আঘাত পায় বিমান সংস্থাগুলো। কারণ জ্বালানি তাদের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের মধ্যে একটি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর বড় এয়ারলাইনগুলোর আয় লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে এবং শেয়ার দরও পড়েছে। মার্কিন বাজার বিশ্লেষণী প্ল্যাটফর্ম টিডি কাউয়েনের বিশেষজ্ঞরা এ খবর প্রকাশ করেছেন।
জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি শুধু বিমান নয়, পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। জ্বালানি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ—স্ট্রাটা ক্রিটিক্যাল মেডিকেল, যারা মানব অঙ্গ উদ্ধার ও পরিবহন করে, তাদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। কোম্পানির সহপধ্যান নির্বাহী মেলিসা টমকিয়েল বলেছেন, “তেলের দাম যদি বড়ভাবে বেড়ে যায়, শেষ পর্যন্ত এর চাপ গ্রাহকের ওপরই পড়বে।”
কংক্রিট পাম্পিং হোল্ডিংসের মতো প্রতিষ্ঠানও অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ সরাসরি গ্রাহকের কাছ থেকে সারচার্জ হিসেবে নিচ্ছে। প্রধান নির্বাহী ব্রুস ইয়াং বলেন, “আমরা আশা করি এটি স্বল্পস্থায়ী হবে। কত দিন এভাবে চলবে বলা কঠিন, তবে কিছুটা হলেও খরচ আমরা পুষিয়ে নেব।” গ্যাসোলিনের দাম বৃদ্ধির ফলে গাড়িশিল্পেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তখন যখন বড় কোম্পানিগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন সাময়িকভাবে কমিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে ফোর্ড ও জেনারেল মোটরসের শেয়ারও কমেছে।
কৃষিক্ষেত্রও এর বাইরে নয়। পারস্য উপসাগরের সার উৎপাদনের বড় অংশে সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। বসন্তকালীন বপনের আগে সার মূল্যের বৃদ্ধি কৃষকের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের সভাপতি জিপি ডুভাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে সতর্ক করেছেন, “যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় খাদ্য সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি
জ্বালানির মূল্য বাড়া সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে নিম্ন আয়ের পরিবারে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই জ্বালানিতে খরচ হয়। কিন্তু এর প্রভাব শুধুই জ্বালানি নয়, অন্যান্য পণ্য ও সেবাতেও ছড়িয়ে পড়ে। ডিজেলের দাম বাড়লে খাদ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়, যার ফলে দোকানে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। একইভাবে জেট জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বিমান ভাড়া বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি পাঁচ বছর ধরে ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পারিবারিক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে ভোক্তারা ব্যয় কমাতে পারে। অথচ ভোক্তা ব্যয়ই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। বিনিয়োগ ব্যাংক বার্কলেসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ পূজা শ্রীরাম বলেন, “তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে ভ্রমণ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ইলেকট্রনিকস এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিতে ব্যয় কমে যায়।”
বার্কলেসের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে গেলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.২ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি দাম দুই থেকে তিন মাস ধরে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার বা তার বেশি থাকে, তাহলে গ্রীষ্মে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৩.৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং বছরের শেষে ৩ শতাংশের কিছু ওপরে থাকতে পারে। যুদ্ধের আগে এটি ২.৭ শতাংশ ধরা হয়েছিল। তবে দাম বৃদ্ধি যদি স্বল্পস্থায়ী হয়, তাহলে এটি শুধু “একটি ক্ষণিক ধাক্কা” হিসেবে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে, বলছেন শ্রীরাম।
প্রবৃদ্ধি কমার শঙ্কা
গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে বছরজুড়ে সেই স্তরে থাকে, তাহলে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.১ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে। এর ফলে ইতিমধ্যেই দুর্বল শ্রমবাজারে আরও চাপ পড়ার আশঙ্কা আছে। গত ছয় মাসে চাকরির সংখ্যা সামান্য কমেছে এবং ফেব্রুয়ারিতে ৯২ হাজার চাকরি কমেছে। শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের ধারণার তুলনায় কম ছিল।
শেয়ারবাজার দীর্ঘ সময় চাপে থাকলে উচ্চ আয়ের পরিবারের ব্যয়ও কমতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পদের মূল্য বৃদ্ধির কারণে তারা অর্থনীতিকে সচল রাখছিল। ইতিহাস বলছে, তেলের সংকট আগেও বড় আঘাত দিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এবং ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় তেলের দাম বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা দেখা দিয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই কয়েকটি দেশের উৎপাদন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ব্যাংক অফ আমেরিকার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা দেখা দিতে পারে। তবে বর্তমানে সেই মাত্রায় দাম বাড়েনি এবং আগের তুলনায় দেশটির কিছু সুরক্ষা রয়েছে। ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক। পাশাপাশি ভারী শিল্পখাত, যা বেশি তেল ও গ্যাস ব্যবহার করে, অর্থনীতিতে আগের তুলনায় অনেক ছোট অংশ দখল করছে। ফলে তেলের বিল বেড়ে গেলেও প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
আবাসন বাজারে অনিশ্চয়তা
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বন্ধকি সুদহার কমানো হয়েছিল এবং গত মাসে ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এতে বসন্তকালীন বিক্রয় মৌসুমে ক্রেতারা বাজারে ফিরবে বলে আশা করা হয়েছিল।
কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় এ মাসে সুদের হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ফেডারেল রিজার্ভ দীর্ঘ সময় সুদের হার উঁচু রাখতে পারে, যা ট্রেজারি বন্ডের ফলন এবং বন্ধকি ঋণের খরচ বাড়ায়। ফ্রেডি ম্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ১২ মার্চ পর্যন্ত ৩০ বছরের স্থির সুদের গড় হার দাঁড়িয়েছে ৬.১১ শতাংশ এবং এটি টানা দ্বিতীয় সপ্তাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রিয়েলটর ডটকমের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জেক ক্রিমেল বলেন, “এ পর্যন্ত সুদের বৃদ্ধির প্রভাব আবাসন বাজারে বড় নয়। আসল ঝুঁকি হলো যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা যদি অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে আঘাত দেয়, তাহলে সম্ভাব্য ক্রেতারা বাড়ি কেনা স্থগিত করতে পারেন। আবাসন বাজার মূলত ভোক্তাদের আস্থার ওপর নির্ভরশীল।”
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও তেলের বাজারে অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, ব্যবসা ও ভোক্তাদের উপর পরোক্ষভাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিমান, কৃষি ও গাড়িশিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে শুরু করে ঘরে বসবাস ও খাদ্য সরবরাহ পর্যন্ত এই ধাক্কা অনুভূত হবে। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, যা পরিবারগুলোর ব্যয় কমিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে ধীর করতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের দশকের তেলের সংকটের চেয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। দেশটি তেলের বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক এবং ফ্র্যাকিং প্রযুক্তি ও অর্থনীতির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য কয়েকটা সুরক্ষা প্রদান করছে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো অনিশ্চয়তার মানসিক প্রভাব ক্রেতা, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসার আস্থা কতটা ধরে রাখা যায়।
এই সংকট সাময়িক হলেও সতর্কতা ও পরিকল্পনা ছাড়া এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। তাই বাজার, নীতি নির্ধারক ও ভোক্তাদের জন্য একসঙ্গে সতর্ক ও সচেতন থাকা এখন সবচেয়ে জরুরি।

