মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের মধ্যে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে ইরানের পাল্টা হামলা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে মন্তব্য করলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা সম্পর্কে যুদ্ধ শুরুর আগেই তাঁকে সতর্ক করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে। সংঘাত থামানোর কোনো স্পষ্ট লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে ইরান নতুন করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালায়। এর ফলে দেশটির আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র ফুজাইরাহ বন্দরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এদিকে আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবুধাবির বানি ইয়াস এলাকায় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করার সময় তার ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলা তার কাছে বিস্ময়কর। তার ভাষায়, “এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ওপর ইরানের আক্রমণ হওয়ার কথা ছিল না। আমরা সত্যিই অবাক হয়েছি।”
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগেই হোয়াইট হাউসকে জানানো হয়েছিল যে ইরানে হামলা হলে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। বিশেষ করে যদি তারা মনে করে ওই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সহযোগিতা করছে।
মঙ্গলবার রাতভর ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পরও ইরান এখনো দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরানের বিভিন্ন স্থানে সরকার–সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও অন্তত তিন সপ্তাহ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে বলেও জানিয়েছে। এছাড়া ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের দিকেও মঙ্গলবার ভোরে রকেট ও ড্রোন হামলা হয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই দূতাবাসের ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী হামলা। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এই সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওয়াশিংটন থেকে জানানো হয়েছে, এই পথ পুনরায় চালু করতে কিছু মিত্র দেশ খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে তেলের ট্যাংকার চলাচল নিরাপদ করার প্রস্তাব দিলেও কয়েকটি দেশ তাতে সাড়া দেয়নি।
ইউরোপের কয়েকটি দেশও একই অবস্থান নিয়েছে। বার্লিনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, জার্মানির সংবিধান অনুযায়ী জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, সংঘাত শুরুর আগে বার্লিনের সঙ্গে ওয়াশিংটন বা তেল আবিব কোনো আলোচনা করেনি। জার্মানি, স্পেন, ইতালি, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও আপাতত ওই এলাকায় সামরিক জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগে মন্তব্য করেছিলেন, ইরানি তেলের বড় ক্রেতা হওয়ায় চীন চাইলে হরমুজ প্রণালী চালু রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। সহায়তা না পেলে তিনি বেইজিং সফর পিছিয়ে দিতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেন। পরে তিনি জানান, সম্ভাব্য সফরটি এক মাস বা তারও বেশি সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
এদিকে সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের সস্তা ড্রোন প্রযুক্তি অঞ্চলজুড়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হয়। পাশাপাশি ফুজাইরাহতে তেল লোডিং কার্যক্রম এবং আবুধাবির শাহ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ইরান আরও সতর্ক করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন মালিকানাধীন শিল্প স্থাপনাগুলোও তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এজন্য এসব স্থাপনার আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

