হরমুজ প্রণালি—বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি এখন কার্যত ইরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও তেহরান যে বিকল্প ব্যবস্থার ভিত গড়ে তুলেছিল, বর্তমানে চলমান যুদ্ধে সেটিই হয়ে উঠেছে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারকেও এখানে অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া ট্যাংকার বহর গড়ে তুলেছিল। এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক বীমা বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না, ফলে সংকটের সময়ও তারা নির্বিঘ্নে তেল পরিবহন চালিয়ে যেতে পারছে।
বিপরীতে, পশ্চিমা সম্পৃক্ত জাহাজগুলো এখন উচ্চ বীমা ব্যয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সরাসরি হামলার আশঙ্কায় হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরে একাধিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—এ জলপথে চলাচল এখন তাদের শর্তে নির্ধারিত হবে। এতে করে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একধরনের ‘অসামরিক শক্তি প্রদর্শন’, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি বাণিজ্যিক চাপকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি থেমে যায়নি। বরং চীনসহ কিছু দেশের সঙ্গে বিকল্প লেনদেন পদ্ধতির মাধ্যমে তারা রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ইউয়ান বা পণ্যের বিনিময়ে লেনদেন—এসব কৌশল ইরানকে একধরনের অর্থনৈতিক সুরক্ষা দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তাদের জ্বালানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞারই এক বিপরীত ফল। দীর্ঘদিন চাপের মুখে থাকায় ইরান এমন এক বিকল্প কাঠামো তৈরি করেছে, যা এখন তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এমনকি, তারা ইয়েমেনের হুতিদের কৌশল অনুসরণ করে বাছাই করে জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করছে—যেখানে পশ্চিমা সংশ্লিষ্ট জাহাজ ঝুঁকিতে আর অন্যরা তুলনামূলক নিরাপদ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। মিত্রদের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হওয়া, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে ওয়াশিংটনের ওপর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও প্রশ্ন তুলেছেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি জলপথের নিরাপত্তা দেবে, যা মূলত অন্য দেশগুলোর জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে জাহাজ পারাপার নিশ্চিত করছে—যা প্রমাণ করে আঞ্চলিক বাস্তবতায় নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে এ অচলাবস্থা শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির এক জটিল লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যেখানে ইরানের কৌশল আপাতত এগিয়ে রয়েছে।

