মধ্যপ্রাচ্যে টানা উত্তেজনার মাঝে অবশেষে কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গেল ওয়াশিংটনের দিক থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে তার প্রশাসন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাপ সামাল দিতে ইরানের তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে—যা পরিস্থিতির নতুন মোড় নির্দেশ করছে।
শুক্রবার (২১ মার্চ) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক তৎপরতা এখন অনেকটাই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তাই এই অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক যুদ্ধ শেষের সবচেয়ে শক্তিশালী ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনেন। তিনি জানান, শুরু থেকেই এই অভিযানের সময়সীমা প্রায় ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, সময়সূচি অনুযায়ী যুদ্ধের সমাপ্তি এখন খুব দূরে নয়—এমনটাই ধারণা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
তবে শুধু সামরিক দিকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চাপের মুখে পড়েছে অনেক দেশ। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, যেসব ইরানি তেল ইতোমধ্যে জাহাজে তোলা হয়েছে, সেগুলোর ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ মার্চের আগে জাহাজে বোঝাই করা ইরানের অপরিশোধিত তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আগামী ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি ও সরবরাহ করা যাবে। এর মাধ্যমে অন্তত স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশও হতে পারে। কারণ যুদ্ধ চলমান থাকলেও জ্বালানি বাজারের ভারসাম্য ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা কিন্তু কমেনি। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দাবি করেছেন, তাদের দেশ শত্রুপক্ষকে ‘চরম ধাক্কা’ দিতে সক্ষম হয়েছে। তার এই বক্তব্যের পরপরই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
এর জবাবে শনিবার ভোরে ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাল্টাপাল্টি এই হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে একদিকে যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত মিলছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ গুটিয়ে নেওয়ার’ বার্তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে যুদ্ধ শেষের সম্ভাবনা, অন্যদিকে মাটিতে চলমান সংঘর্ষ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে পরবর্তী বড় সিদ্ধান্তের।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক জটিল সমীকরণের মধ্যে রয়েছে। সামরিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের দাবি করলেও অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটন এখন কৌশল বদলের পথে হাঁটছে। সামনে কী ঘটবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কত দ্রুত থামে এবং এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।

