ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের উত্তেজনা, সামরিক শক্তি প্রদর্শন আর কূটনৈতিক অবস্থান—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এখন সবচেয়ে বড় চাপে ফেলেছে তেলের বাজার। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যখন লাগামছাড়া, তখন সেই চাপ সামাল দিতে গিয়ে অবশেষে নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকেই সরে আসতে বাধ্য হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ওয়াশিংটন এখন এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও অকল্পনীয় ছিল। শত্রু দেশ ইরানের প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, যাতে এই তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারে। মূলত সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকা এই তেল যাতে ভারত, জাপান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো মিত্র দেশগুলো কিনতে পারে—সেই লক্ষ্যেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোতে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন বিকল্প পথ খুঁজেছে। নিজেদের কৌশলগত রিজার্ভ থেকে তেল ছেড়েছে, রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে, এমনকি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই সব পদক্ষেপই তেলের বাজারকে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এর প্রভাব স্পষ্ট—পেট্রোলের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। সাধারণ জনগণের ওপর এর চাপ বাড়ছে, আর রাজনৈতিকভাবে সেটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানি তেলকে বাজারে আনা ছাড়া কার্যত আর কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই সিদ্ধান্তকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, এই তেল বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে শুধু দাম কমানোই নয়, বরং ইরানের কৌশলকেই উল্টোভাবে মোকাবিলা করা হবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দিকটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বেশ অস্বস্তিকর। একসময় বারাক ওবামার ইরান চুক্তির কঠোর সমালোচক ছিলেন ট্রাম্প। সেই তিনিই এখন পরোক্ষভাবে ইরানের তেল বিক্রিতে সহায়তা করছেন—যা তার আগের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।
প্রশাসন অবশ্য যুক্তি দিচ্ছে, এই তেল যেকোনোভাবেই বাজারে আসত—সম্ভবত চীনের মাধ্যমে। এখন অন্তত মিত্র দেশগুলো এই তেল কিনতে পারবে, যা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এটি আসলে একটি কৌশলগত পিছু হটা, যা যুদ্ধের বাস্তব চাপের ফল।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ১৪ কোটি ব্যারেল তেল দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। এটি বিশ্ববাজারের মাত্র দেড় দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। অর্থাৎ, এই তেল দ্রুত শেষ হয়ে গেলে আবারও একই সংকটে পড়তে হবে। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় যেতে পারে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য হয়ে ইরানের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে অবশ্য আশাবাদী বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তারা বলছে, সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হলে তেলের দাম স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হবে। তবে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এই মূল্যবৃদ্ধিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি একে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট একটি ‘সাময়িক যন্ত্রণা’ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে প্রশাসনের ভেতরে একটি ছোট নীতিনির্ধারক দল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা গ্রীষ্মকালীন জ্বালানি ব্যবহারের ওপর কিছু পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়েও ভাবছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি সচল না হবে, ততক্ষণ এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান পাওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি একটি বড় সত্য সামনে এনে দিয়েছে—যুদ্ধের ময়দানে শক্তি যতই থাকুক, অর্থনীতির বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে প্রভাবিত করে। তেলের প্রবাহ থেমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি থমকে যায়, আর সেই বাস্তবতাই এখন ট্রাম্প প্রশাসনকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।

