মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল সংঘাত নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি একে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়—এটি সরাসরি জড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বিশেষ করে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণের সঙ্গে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—এই যুদ্ধ কি কেবল নিরাপত্তার জন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও?
যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পাওয়া: দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ
নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে একটি বিষয় বারবার বলেছেন—ইরান ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তিনি শুধু কথায় নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও এই বার্তা ছড়িয়েছেন। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া তার রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ ছিল।
কিন্তু এতদিন একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল—যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইত না। ফলে ইসরাইল একা বড় আকারের সংঘাতে নামতে দ্বিধায় ছিল।
এবার সেই চিত্র বদলেছে। নেতানিয়াহু সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে পেরেছেন। এর ফলে শুধু সামরিক শক্তিই বাড়েনি, বরং আন্তর্জাতিক বার্তাও গেছে—ইসরাইল একা নয়।
এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়।
যুদ্ধের মূল্য: প্রাণহানি ও বৈশ্বিক প্রভাব
এই যুদ্ধের মানবিক মূল্যও কম নয়। ইরানে এখন পর্যন্ত ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। লেবাননে ইসরাইলি হামলায় প্রাণ গেছে প্রায় ১,০০০ মানুষের। এছাড়া আশপাশের অন্যান্য দেশেও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে, যেখানে আরও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ব অর্থনীতিও এর ধাক্কা খাচ্ছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেল রেশনিং পর্যন্ত হতে পারে।
তবুও, এই বড় মূল্য সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব অন্য দিকেও এগোচ্ছে।
কীভাবে এই যুদ্ধ নেতানিয়াহুর সমস্যার সমাধান হতে পারে?
১। ইরান হুমকির বাস্তব প্রমাণ তৈরি
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহু যে হুমকির কথা বলে আসছিলেন, এই যুদ্ধ সেটিকে “বাস্তব” হিসেবে তুলে ধরেছে। এখন তিনি বলতে পারেন—তার সতর্কবার্তা অযৌক্তিক ছিল না।
যদি ইরান দুর্বল হয়, তবে ভবিষ্যতে এটি তার জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
২। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়া
ইরানের প্রভাব শুধু নিজ দেশে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের মিত্রগোষ্ঠী—যেমন হিজবুল্লাহ—দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক আক্রমণ ও আঞ্চলিক পরিবর্তনের ফলে এই শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের পতনও ইসরাইলের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে।
ফলে নেতানিয়াহু এখন দাবি করতে পারেন—ইসরাইলই অঞ্চলের প্রধান শক্তি।
৩। দুর্নীতির মামলা থেকে রাজনৈতিক ‘ঢাল’
২০১৯ সাল থেকে নেতানিয়াহু তিনটি দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে, এমনকি ১০ বছরের কারাদণ্ডও হতে পারে।
কিন্তু যুদ্ধ তাকে একটি বড় সুযোগ দিয়েছে—জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে আদালতের কার্যক্রম পিছিয়ে দেওয়া।
তিনি ইতোমধ্যে এসব মামলাকে “অযৌক্তিক” বলে অভিহিত করেছেন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদনও জানিয়েছেন। যুদ্ধ চলাকালীন এই বিষয়টি আরও চাপা পড়ে যেতে পারে।
৪️। বিচারব্যবস্থা সংস্কারের বিতর্ক আড়ালে ফেলা
নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের পরিকল্পনা ইসরাইলে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এটিকে “গণতন্ত্রবিরোধী” বলে প্রতিবাদ করেছিল।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই আন্দোলন অনেকটাই থেমে গেছে।
সমালোচকদের মতে, এই সুযোগে তিনি বিতর্কিত আইন পাস করার চেষ্টা করছেন—যার মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতা আরও বাড়বে এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা কমবে।
৫️। নির্বাচনী রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়া
নেতানিয়াহু আগে থেকেই রাজনৈতিক চাপে ছিলেন। অক্টোবর ৭ হামলার আগে ও পরে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে অনেকেই তাকে দোষারোপ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচনে তার জয় অনিশ্চিত ছিল।
কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি সবকিছু বদলে দিয়েছে। “যুদ্ধকালীন নেতা” হিসেবে তার ভাবমূর্তি শক্তিশালী হয়েছে। জনমত জরিপেও দেখা গেছে, তার প্রতি আস্থা বেড়েছে—৬০ শতাংশ থেকে ৬২ শতাংশে।
এখন আলোচনা চলছে—তিনি হয়তো আগাম নির্বাচন ঘোষণা করতে পারেন, যাতে এই বাড়তি সমর্থন কাজে লাগানো যায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও চাপ
যদিও এই যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য কিছু সুবিধা তৈরি করছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি ট্রাম্পের কিছু সমর্থকও এই যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শেষ কোথায়, সেটাও এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য এক দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে এটি বড় ঝুঁকি—মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে। অন্যদিকে, এটি তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সমস্যাগুলোর একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবেও কাজ করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ তাকে ক্ষমতায় আরও শক্তিশালী করবে, নাকি উল্টো চাপ বাড়াবে—তা নির্ভর করছে যুদ্ধের পরিণতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর।

