মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই আরও বিপজ্জনক দিকে মোড় নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ২২ মার্চ প্রকাশিত সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালায়, তাহলে পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তাদের দেশের অবকাঠামোতে আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও তেল স্থাপনাগুলো “অপরিবর্তনীয়ভাবে ধ্বংস” করা হতে পারে। রবিবার (২২ মার্চ) সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরানের ওপর হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া শুধু সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং পুরো অঞ্চলে তার প্রভাব পড়বে।
এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকিকে কেন্দ্র করে। শনিবার তিনি ঘোষণা দেন, ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করে দেবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ইরান জানিয়েছে, তারা কার্যত এই প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে তাদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ বন্ধ নয়—শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যেই ১৯৭০-এর দশকের পর সবচেয়ে বড় তেল সংকট তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। এর জবাবে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে।
ইরানের দাবি, এসব হামলা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তবে এতে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজার ও বিমান চলাচলেও।
বর্তমানে যুদ্ধটি চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে, এবং পরিস্থিতি যে আরও জটিল হতে যাচ্ছে—তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধে অংশ নেয়। তিনি দাবি করেন, ইতোমধ্যেই কিছু দেশ এই দিকেই এগোচ্ছে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক পর্যায়েও তৎপরতা চলছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান পৃথকভাবে ইরান, মিশর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল—কিভাবে এই সংঘাতের অবসান ঘটানো যায়।
ইরান সতর্ক করে দিয়েছে, যদি তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়ায় তেলের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে অস্থিরতা চলতে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক সীমায় সীমাবদ্ধ নেই—বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলো আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে যদি কূটনৈতিক সমাধানের পথ দ্রুত খুঁজে না পাওয়া যায়।

