মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি এফ-৩৫কে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। ইরান দাবি করেছে, তারা এই ‘স্টেলথ’ যুদ্ধবিমানে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি, তবুও ঘটনাটি সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে, যখন একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যের একটি ঘাঁটিতে হঠাৎ জরুরি অবতরণ করে। প্রথমদিকে বিষয়টি সাধারণ প্রযুক্তিগত সমস্যা বলে মনে করা হলেও, পরে মার্কিন গণমাধ্যমের একাধিক সূত্র জানায়—যুদ্ধ মিশন শেষে ফেরার পথে বিমানটি ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও একই দাবি করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র অবশ্য জানিয়েছেন, বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। তবে কী কারণে এই জরুরি অবতরণ, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন।
একই সময় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস একটি বিবৃতিতে দাবি করে, তারা একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্য করে সফল আঘাত হেনেছে। পরে একটি ভিডিও প্রকাশ করে তারা দেখানোর চেষ্টা করে যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি এফ-৩৫ বিমানকে আঘাত করছে। যদিও এই ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শক্তির অন্যতম প্রধান ভরসা। লকহিড মার্টিন নির্মিত এই বিমানটি স্টেলথ প্রযুক্তির মাধ্যমে রাডার এড়িয়ে চলতে পারে এবং শত্রুপক্ষের নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এতে অত্যাধুনিক সেন্সর, ৩৬০ ডিগ্রি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রয়েছে, যা পাইলটকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
এই যুদ্ধবিমানের বিশেষত্ব হলো—এটি শুধু আক্রমণই চালায় না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের পুরো পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাইলটের সামনে তুলে ধরে। ফলে এটি আকাশযুদ্ধে একধরনের প্রযুক্তিগত আধিপত্য তৈরি করে। বিশ্বের বহু দেশ, যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল—এই বিমান ব্যবহার করছে।
এফ-৩৫-এর তিনটি ভিন্ন সংস্করণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত সংস্করণটি সাধারণ রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। আরেকটি সংস্করণ খুব অল্প জায়গা থেকেও উড্ডয়ন করতে সক্ষম এবং হেলিকপ্টারের মতো উল্লম্বভাবে অবতরণ করতে পারে। তৃতীয়টি মূলত দীর্ঘ দূরত্বে উচ্চগতির অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি সামরিক সাফল্য নয়—বরং বিশ্ব সামরিক প্রযুক্তির ধারণাকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এতদিন পর্যন্ত কোনো যুদ্ধে এফ-৩৫ সরাসরি শত্রুপক্ষের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ‘অজেয়’ বলে কিছু নেই। যদি ঘন ও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ধরনের স্টেলথ বিমান প্রবেশ করে, তাহলে সেটিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না—এই ঘটনায় কোনো সাধারণ ভূমি থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাই কাজ করেছে, নাকি আরও উন্নত কোনো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো দৃঢ়। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাদের বিমান নির্বিঘ্নে উড্ডয়ন করছে এবং কেউ সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারছে না। ফলে ইরানের দাবি ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বেশ কিছু ড্রোন ও যুদ্ধবিমান হারিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এফ-৩৫-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া—এটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনা এখনো রহস্যে ঘেরা। কিন্তু এটি পরিষ্কার যে, যদি এফ-৩৫ সত্যিই আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ কৌশল, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। আর যদি তা না-ও হয়ে থাকে, তবুও এই দাবি নিজেই একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ—যা প্রতিপক্ষের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

