ইরানের যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের মাধ্যমে তেল ও গ্যাসের বাণিজ্য স্থগিত হয়ে গেছে। এর প্রভাব দূরের দেশগুলোতেও পড়ছে, যারা হঠাৎই জ্বালানি সরবরাহে সংকটে পড়েছে।
পারস্য উপসাগর বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করে। হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে পেট্রল, জেট ফুয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানিপণ্যের মূল্যও চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংকটের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত। তবে সব দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নয়।
২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে গেছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই যায় এশিয়ায়। দীর্ঘদিন ধরে চীন এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। তাদের মোট জ্বালানির এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখান থেকে আসে, তাই এই সংকট তাদের জন্য বড় ধাক্কা।
কিছু দেশ প্রায় পুরোপুরি উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তান জ্বালানি বাঁচাতে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালানোর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি দূরশিক্ষা ও দূরকর্মও চালুর কথা ভাবছে। থাইল্যান্ডে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি তহবিলে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ভারতের পরিবারগুলো রান্নার গ্যাস সংকটে পড়েছে, আর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জেট ফুয়েলের অভাবে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
ইউরোপ ঐতিহ্যগতভাবে পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর কম নির্ভরশীল। তারা রাশিয়া থেকে গ্যাস বেশি পেত, এখন যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের ওপর নির্ভর করছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের জ্বালানির সমস্যা আগের মতোই চলতে থাকে। রাশিয়া তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক ও দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস উৎপাদক হলেও, যুদ্ধের কারণে তাদের জ্বালানি বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা আছে।
বর্তমান সংকটে ইউরোপীয় দেশগুলো দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে শিল্প খাত পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং সস্তা চীনা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পর তেলের দাম বাড়ে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে তারা সাময়িকভাবে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তা করেনি।
সিশেলস ও মরিশাস পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। নাইজেরিয়া নিজে তেল উৎপাদক হলেও কিছু জ্বালানি আমদানি করে। শুধু তেল-গ্যাস নয়, সার উৎপাদনেও এই অঞ্চলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সারের দাম বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে, দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের চাপও বেড়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদক হওয়ায় সরাসরি প্রভাব কম। তবু তেলের দাম বাড়ায় তাদের অর্থনীতিও চাপের মুখে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি পৌঁছেছে। পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ১ ডলার বেড়েছে। জ্বালানি খরচ বাড়ায় উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো ফ্লাইট কমাচ্ছে, আর মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় গৃহঋণের সুদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা তেলের দাম আরও বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল নয় বলে দাবি করে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ:
- কুয়েত
- ইরাক
- বাহরাইন
- কাতার
- সংযুক্ত আরব আমিরাত
- সৌদি আরব ও ইরান

