ইরান ও ইসরায়েল–এর চলমান সংঘাতে নতুন এক ধরনের অস্ত্র বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে—ক্লাস্টার মিউনিশন বা ক্লাস্টার বোমা। এটি এমন একটি অস্ত্র, যা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
২৪ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ মার্চ ইসরায়েলের অভিযানে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান একাধিক ক্লাস্টার মিসাইল ছোড়ে। সেই হামলায় তেল আবিবের কাছে রামাত গান এলাকায় দুইজন নিহত হন। তারা নিজেদের বাড়িতে নিরাপদ কক্ষে যাওয়ার আগেই বিস্ফোরণের শিকার হন, যা ইসরায়েলের সতর্কবার্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ক্লাস্টার মিসাইলের গঠন সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নয়। এতে একটি বড় বিস্ফোরক থাকার বদলে থাকে অনেকগুলো ছোট ছোট বোমা, যেগুলোকে বলা হয় বোম্বলেট। মিসাইলটি লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌঁছালে এর বাহ্যিক আবরণ খুলে যায় এবং ভেতরের বোমাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একটি মিসাইল থেকে ২০–৩০টি থেকে শুরু করে ৭০–৮০টি পর্যন্ত বোম্বলেট ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে একটিমাত্র আঘাত মুহূর্তেই বহু বিস্ফোরণে পরিণত হয় এবং একটি বড় এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হয়।
এই কারণেই ক্লাস্টার মিউনিশনকে এত ভয়ংকর বলা হয়। এটি একসঙ্গে বহু স্থানে আঘাত হানতে পারে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যখন একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল মাঝপথে ভেঙে গিয়ে একাধিক লক্ষ্য তৈরি করে, তখন সেটিকে থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসরায়েলের মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, একটি ক্লাস্টার মিসাইল যদি প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু একটি বিস্ফোরণ ঘটায় না, বরং বহু স্থানে একসঙ্গে আঘাত করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বোমাগুলোর সবগুলো বিস্ফোরিত হয় না। অনেক বোম্বলেট মাটিতে পড়ে অবিস্ফোরিত অবস্থায় থেকে যায়, যেগুলোকে “ডাড” বলা হয়। এগুলো বছরের পর বছর মাটির নিচে বা উপরে পড়ে থাকতে পারে এবং সামান্য স্পর্শেই বিস্ফোরিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবিস্ফোরিত বোমাগুলোই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ শিশুদের মতো সাধারণ মানুষ এগুলোকে অজান্তেই স্পর্শ করতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ক্লাস্টার অস্ত্রের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের ৯৩ শতাংশই ছিল বেসামরিক মানুষ।
ইরানের কাছে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যবহার আরও পরিকল্পিতভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় মিসাইল ভাণ্ডার রয়েছে। Shahab-3, Emad, Ghadr-1, Khorramshahr, Sejjil, Kheibar Shekan এবং Haj Qassem-এর মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল ছাড়াও Soumar, Ya-Ali, Quds, Hoveyzeh, Paveh এবং Ra’ad-এর মতো ক্রুজ মিসাইল রয়েছে, যেগুলো বড় ধরনের পে-লোড বহন করতে পারে। Soumar মিসাইলের পাল্লা ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বলে ধারণা করা হয়।
চলমান সংঘাতে ইসরায়েলে ইতোমধ্যে ৪,৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তেল আবিবে একাধিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং আরাদ ও ডিমোনা শহরে হামলার ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ডিমোনা, যেখানে একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, সেখানে হামলা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শনিবারের হামলায় অন্তত ১৮০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্লাস্টার মিসাইল ব্যবহারের কারণেই এই হামলাগুলো এখন বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। একটি মিসাইল থেকে যখন বহু বিস্ফোরণ ঘটে, তখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি বোমাকে আলাদা করে থামানো সম্ভব হয় না। একই সঙ্গে উদ্ধারকাজ, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ এবং অবকাঠামো মেরামতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। ফলে কম সংখ্যক হামলাতেই বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয়, যাকে সামরিক ভাষায় “ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার” বলা হয়।
আইনগত দিক থেকেও এই অস্ত্র নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০০৮ সালের ক্লাস্টার মিউনিশন কনভেনশনের মাধ্যমে ১১১টি দেশ এই অস্ত্র নিষিদ্ধ করেছে। তবে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির অংশ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, জনবহুল এলাকায় এই অস্ত্র ব্যবহার করলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী হতে পারে, কারণ এটি নির্বিচারে ক্ষতি করে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ক্লাস্টার বোমা নতুন কিছু নয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উভয় পক্ষই এই অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে ক্লাস্টার মিউনিশন সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। একইভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও অতীতে লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে এই অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৬ সালে দক্ষিণ লেবাননে লাখো অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমা পড়ে থাকার কথা জানিয়েছিল জাতিসংঘ, যা বহু বছর ধরে মানুষের জন্য হুমকি হয়ে ছিল।
সব মিলিয়ে, ক্লাস্টার মিউনিশন শুধু একটি সামরিক প্রযুক্তি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের কারণ। তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণের পাশাপাশি এর অবিস্ফোরিত অংশ ভবিষ্যতেও প্রাণহানি ঘটাতে পারে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে এই অস্ত্রের ব্যবহার দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরতম স্তর পর্যন্ত।

