মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, আর এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগছে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সেই দেশগুলো, যেগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো একসঙ্গে একাধিক সংকটে পড়েছে। তাদের একদিকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার দিয়ে সেই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, জর্ডান, মিশর ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব দেশের অর্থনীতি এমনিতেই নানা চাপে ছিল, তার ওপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। সরকারগুলো একদিকে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দিতে চাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের কারণে দীর্ঘমেয়াদে সেই চাপ বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পাকিস্তানে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই জটিল আকার ধারণ করেছে। দেশটি তার প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। স্কুল বন্ধ রাখা, সরকারি দপ্তরে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা, অনেক কর্মচারীকে বাসা থেকে কাজ করতে বলা এবং সরকারি কাজে জ্বালানি ব্যবহারে কাটছাঁট করা হয়েছে। যদিও ধর্মীয় উৎসবের আগে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশটি তার প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় জ্বালানি রেশনিং চালু করা হয়েছে, তবুও অনেক পেট্রোল পাম্পে সরবরাহ কমে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
শ্রীলঙ্কা, যা কয়েক বছর ধরেই অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে, সেখানেও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে একটি দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং যানবাহনের জন্য বাধ্যতামূলক জ্বালানি কার্ড চালু করা হয়েছে। তবুও আশঙ্কা করা হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির জ্বালানি মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে।
মিশরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। সরকার জ্বালানি খাতে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে আসছে, যার ফলে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। এই চাপ সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ দোকান, বিপণিবিতান ও খাবারের দোকানের সময় সীমিত করেছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। যদিও সরকার বলছে, বড় ধরনের সংকট এড়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট শুধু জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, আর পরিবহন খরচ বাড়লে খাদ্যসহ সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই চাপ সবচেয়ে বেশি কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও জ্বালানির পেছনে ব্যয় হয়।
একই সঙ্গে অনেক দেশের মুদ্রার মান কমে যাচ্ছে, যার ফলে আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ জায়গায় অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে, যার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে।
সরকারগুলো সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে ভর্তুকি দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। সরকারি আয় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক দেশকে কঠোর আর্থিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এতে করে সামাজিক অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অনেক দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এর প্রভাব এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।

