যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়াংগার ইরান যুদ্ধ ও চলমান কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান সংঘাতে কৌশলগতভাবে ইরানই এগিয়ে রয়েছে। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
দ্য ইকোনমিস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইহুদিবাদী দৈনিক ইয়োদিওথ আহরোনাথ।
স্যার অ্যালেক্স ইয়াংগার বলেন, ইরান জ্বালানি যুদ্ধের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে এবং সেই কৌশল ব্যবহার করে সংঘাতকে বৈশ্বিক পর্যায়ে বিস্তৃত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চললেও এর ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।
এই প্রেক্ষাপটে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে অবমূল্যায়ন করেছে এবং প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে গেছে।
তিনি বলেন, ইরান এখন এগিয়ে আছে এবং এই বাস্তবতা মেনে নিতে তাঁর খারাপ লাগছে। কর্মজীবনের বড় অংশ তিনি ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-এর সহিংসতা নিয়ে কাজ করেছেন। আলি খামেনি-র মৃত্যুতেও তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোনো আবেগ কাজ করেনি বলে জানান। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের জটিলতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি।
ইয়াংগারের মতে, তেহরান বর্তমান যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ইরান প্রত্যাশার তুলনায় বেশি স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে এবং গত বছরের জুন থেকেই তারা তাদের সামরিক সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে শক্তিশালী বিমান হামলার মধ্যেও তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ইরান ‘হরাইজন্টাল এসকেলেশন’ কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের পাল্লার মধ্যে থাকা বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। প্রথমে এটি অযৌক্তিক মনে হলেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করতে কার্যকর হয়েছে।
ইয়াংগার বলেন, জ্বালানি যুদ্ধের গুরুত্ব বুঝে ইরান গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধের হুমকি দেয়, যার ফলে সংঘাত বৈশ্বিক রূপ নেয়। দুর্বল অবস্থান থেকেও তারা কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
এ সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য ইরানকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে ইরান একটি অস্তিত্বের লড়াইয়ে রয়েছে এবং তিনি দেশটিকে কোণঠাসা দেখতে চান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব সিদ্ধান্তেই এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। ফলে ইরানের স্থিতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তুলনায় বেশি, যা তাদের কৌশলগত প্রাধান্য দিয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে তেহরানের কাছে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে।
প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—দেশটির তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা, দেশীয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করা।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখার কথাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।
তবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তারা ট্রাম্পকে উপহাস করে বলেছে, তিনি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন।

