ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা শুরুর পর ইতোমধ্যে ২৫ দিন পেরিয়েছে, আর আজ এই সংঘাত ২৬তম দিনে প্রবেশ করেছে। শুরু থেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও তীব্র হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়াই এই সামরিক অভিযান শুরু করেন—যা নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক বা বড় কোনো হুমকি নয়, তাই এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাটরা পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে ভোটের আহ্বান জানায়। বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে আগের দুইবারের মতো এবারও সেই প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে নাকচ হয়ে যায়।
ভোটাভুটিতে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে পড়ে ৪৭টি ভোট, আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে পড়ে ৫৩টি ভোট। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। এই ভোটকে ‘দলভিত্তিক ভোট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ প্রায় সব সিনেটরই নিজেদের দলের অবস্থান অনুযায়ী ভোট দিয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে উভয় দলের একজন করে সদস্য নিজ দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সিনেটর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা জানতেন যে ভোটে তারা হেরে যেতে পারেন, তবুও তারা এই প্রস্তাব তুলেছেন মূলত একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে আনার জন্য।
ডেমোক্র্যাটদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কেবল কংগ্রেসের মাধ্যমেই কোনো দেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা যায়। প্রেসিডেন্ট চাইলে সীমিত পরিসরে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা এককভাবে তার নেই।
এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে ১৯৭৪ সালে সংবিধানে ‘যুদ্ধ ক্ষমতা সংশোধনী’ যুক্ত করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের অনুমোদনহীন সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার ক্ষমতা পায়। ডেমোক্র্যাটরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আইনের প্রয়োগ জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটরা আসলে ট্রাম্পকে চাপের মুখে ফেলতে চাইছেন, যাতে তিনি কংগ্রেসের ভূমিকা স্বীকার করেন এবং যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হন।
এদিকে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, শুধু ডেমোক্র্যাট সমর্থকরাই নয়, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের বড় একটি অংশও এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। এতে করে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তারা প্রতি সপ্তাহেই এ ধরনের ভোটের আয়োজন চালিয়ে যাবেন। যতদিন না প্রশাসন কংগ্রেসে এসে যুদ্ধ শুরুর কারণ ব্যাখ্যা করছে, ততদিন এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে কংগ্রেসের সামনে আসছে না, কারণ তাদের কাছে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্ত যুক্তি নেই।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ এখন শুধু আন্তর্জাতিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। সামনে এই বিরোধ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

