মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এখন এক জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামাতে উদ্যোগ নিচ্ছে বলে দাবি করছে, অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে— কোনো সংলাপই চলছে না। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা, যা ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে পাঠিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবটি সরাসরি নয়, বরং পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা চাইলে এই দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আয়োজক হতে প্রস্তুত।
তবে এখানেই শুরু হচ্ছে আসল জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ইতোমধ্যে তেহরানের সঙ্গে “খুব ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনা চলছে। কিন্তু ইরান বারবার সেই দাবি অস্বীকার করে বলছে— যুক্তরাষ্ট্র আসলে “নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছে”।
যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব
এই সংঘাতের সূচনা হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে— ঠিক তখনই যখন আলোচনা চলছিল। এরপর থেকে যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশটিতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৫০০ এবং আহত হয়েছেন ১৮,৫৫১ জন। শুধু মানবিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই যুদ্ধ বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে চলে যায়, যেখানে যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবে কী আছে?
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনায় যুদ্ধ থামানোর জন্য বেশ কিছু কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই পুরো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি, তবুও সম্ভাব্য কিছু মূল দিক সামনে এসেছে—
- ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি
- Natanz, Isfahan এবং Fordow-এর পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস
- ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না— এমন স্থায়ী প্রতিশ্রুতি
- সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে হস্তান্তর
- ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পরিসীমায় সীমাবদ্ধতা
- আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ
- উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ
- হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া
- ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
- বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা
এই প্রস্তাবের মাধ্যমে একদিকে চাপ তৈরি করা হয়েছে, অন্যদিকে কিছু সুবিধার কথাও বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কি বদলেছে?
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালের সংঘাতে যেসব পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছিল, সেগুলোই এখন আবার আলোচনার কেন্দ্রে। তবে এবার সরাসরি শাসন পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও ১৫ দফা পরিকল্পনায় তা স্পষ্টভাবে নেই।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরান শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাদের বক্তব্য— যুদ্ধের মাঝখানে আলোচনার কথা বলা মানে দুর্বলতা স্বীকার করা।
ইরানের সামরিক মুখপাত্ররা প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করে বলেছেন, “আমরা কখনোই তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাব না— এখন নয়, ভবিষ্যতেও নয়।”
তবে বাস্তবতা হলো, সম্পূর্ণ অস্বীকারের মাঝেও কিছু ‘পরোক্ষ যোগাযোগ’ চলছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানের শর্ত কী?
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকসিয়ান ১১ মার্চ যুদ্ধ শেষ করার জন্য কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেন—
- ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকার করতে হবে
- যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
- ভবিষ্যতে হামলা না করার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে
- সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে
এছাড়া আরও কিছু দাবি উঠে এসেছে—
- মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ
- হরমুজ প্রণালির ওপর নতুন আইনি নিয়ন্ত্রণ, যেখানে ইরানের প্রভাব থাকবে
ইরানের ভেতরের ভিন্নমত
এই যুদ্ধ ইরানের অভ্যন্তরেও কিছু বিভাজন সামনে এনেছে। একদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক বাহিনী কঠোর অবস্থানেই থাকতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পার্থক্য ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আলোচনা কি সম্ভব?
সবকিছুর পরেও কিছু আশা এখনও রয়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের উচ্চ খরচ— অর্থনৈতিক ও মানবিক— দুই পক্ষকেই চাপের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি ইরানও আঞ্চলিক চাপের মুখে রয়েছে।
একজন বিশ্লেষকের মতে, আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ। তবে চুক্তি সফল হবে কি না— তা এখনো বড় প্রশ্ন।
শেষ কথা
বর্তমান পরিস্থিতি একধরনের অদ্ভুত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে— একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে কূটনীতি। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়, কিন্তু একই সঙ্গে দরজা পুরোপুরি বন্ধও করছে না।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—
👉 এই সংঘাত কি আলোচনার টেবিলে শেষ হবে, নাকি আরও বড় যুদ্ধের দিকে এগোবে?

