মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন আর শুধু সেই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে দূরবর্তী দেশগুলোতেও। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এখন সেই প্রভাবের এক স্পষ্ট উদাহরণ।
দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনে আবারও ফিরে এসেছে দীর্ঘ লাইন, অনিশ্চয়তা আর সীমিত সরবরাহের বাস্তবতা। ক্যান্ডির এক ব্যস্ত জ্বালানি স্টেশনে দেখা যায়, ত্রিচক্রযান চালক কীর্তি রত্না ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মাত্র ২০ লিটার জ্বালানি পাওয়ার আশায়।
একসময় যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় জ্বালানি কেনা ছিল সহজ, এখন তা হয়ে গেছে নিয়ন্ত্রিত ও সীমাবদ্ধ। এই পরিবর্তন শুধু একটি ব্যক্তির জীবনের নয়—পুরো দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেই বদলে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ: সংকটের মূল কারণ
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই পথ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
শ্রীলঙ্কা তার মোট জ্বালানির প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে এই পথ দিয়ে। ফলে সরবরাহে হঠাৎ এই বিঘ্ন দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শ্রীলঙ্কার নিজস্ব মজুত ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। দেশটি সর্বোচ্চ এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি সংরক্ষণ করতে পারে। ফলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত সংকট তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
আবারও রেশনিং: সীমিত জ্বালানি, সীমাহীন ভোগান্তি
এই পরিস্থিতিতে সরকার বাধ্য হয়ে পুনরায় জ্বালানি রেশন ব্যবস্থা চালু করেছে। নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী—
মোটরসাইকেল পায় সপ্তাহে ৮ লিটার,
ত্রিচক্রযান ২০ লিটার,
ব্যক্তিগত গাড়ি ২৫ লিটার,
বাস ১০০ লিটার ডিজেল,
এবং পণ্যবাহী যানবাহন ২০০ লিটার ডিজেল।
কিন্তু এই সীমিত সরবরাহও এখন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে পারছেন না। পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা কমে যাচ্ছে, আর দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তার ওপর জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে। বাসভাড়া ইতোমধ্যে ১২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় ধাক্কা।
খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে
সংকটের প্রভাব এখানেই শেষ নয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া সার পরিবহন হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষি খাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনে। ফলে শ্রীলঙ্কাসহ পুরো এশিয়া অঞ্চলে খাদ্যদ্রব্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে, যা অর্থনৈতিক চাপকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।
অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি আবারও ফিরে আসছে
২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকট এখনো শ্রীলঙ্কার মানুষের মনে তাজা। তখন জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি দেশটিকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল।
সেই সময় দীর্ঘ লাইন, বিদ্যুৎ সংকট এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের অভাব মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। গণবিক্ষোভের মুখে সরকার পরিবর্তন পর্যন্ত ঘটে।
বর্তমান পরিস্থিতি যদিও ভিন্ন কারণে তৈরি হয়েছে, তবুও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা অনেকটাই একই রকম। অনেকেই বলছেন, “পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু কষ্টের ধরন একই রয়ে গেছে।”
সরকার চাপে, অর্থনীতি ঝুঁকিতে
বর্তমান সরকার একদিকে জনগণকে স্বস্তি দিতে চায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ভারসাম্যও ধরে রাখতে হচ্ছে। জ্বালানির পুরো দাম না বাড়িয়ে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, যার ফলে প্রতি মাসে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি পুরো দাম বাড়ানো হয়, তাহলে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, উৎপাদন কমে যাবে এবং কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা লাগবে।
এ কারণে সরকার একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছে—একদিকে ক্ষতি মেনে নেওয়া, অন্যদিকে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া।
বিকল্পের সন্ধানে ব্যস্ততা
সংকট মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা এখন বিভিন্ন বিকল্প উৎস খুঁজছে। নতুন জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি পুরনো সংরক্ষণাগার সংস্কার করে মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে এই উদ্যোগগুলো বড় কোনো স্বস্তি এনে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বর্তমান পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর। যদি হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে শ্রীলঙ্কার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—জ্বালানি সংকটের সঙ্গে খাদ্য সংকটও যুক্ত হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।
ক্যান্ডির সেই ত্রিচক্রযান চালকের কথায় যেন পুরো বাস্তবতাই ধরা পড়ে—
“আগে জ্বালানি ছিল, কিন্তু কেনার টাকা ছিল না। এখন টাকা আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই।”
এই এক বাক্যেই যেন বর্তমান শ্রীলঙ্কার সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সমস্যার রূপ বদলেছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা এখনো একই রয়ে গেছে।

