বর্তমান বিশ্বে জ্বালানির একটি বড় অংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে। এই গ্যাসকে দূর-দূরান্তে সহজে পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তরলে রূপান্তর করা হয়—এটিই এলএনজি বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস।
প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি হয় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মাটির গভীরে জৈব পদার্থের পচন, তাপ ও চাপের ফলে। এই গ্যাসকে যখন প্রায় মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা করা হয়, তখন এটি তরলে পরিণত হয়। এতে এর আয়তন প্রায় ৬০০ গুণ কমে যায়, ফলে বিশাল পরিমাণ গ্যাস অল্প জায়গায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা সম্ভব হয়।
এই তরল অবস্থায় এলএনজি বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে। তাই বড় বড় তাপরোধী ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করে বিশেষ জাহাজে করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আবার এটিকে গরম করে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়, যাকে পুনরায় গ্যাসে ফেরানো প্রক্রিয়া বলা হয়। এরপর পাইপলাইনের মাধ্যমে তা সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে।
কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
এলএনজি আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জড়িত। বাসাবাড়িতে রান্না, গরম পানি তৈরি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে এটি ব্যবহৃত হয়। অনেক দেশে এটি কয়লা ও তেলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিল্পখাতে এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত। সার, প্লাস্টিক, রং, ওষুধ—এসব উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে।
এছাড়া ভারী যানবাহন ও জাহাজ চালাতেও এখন এলএনজি ব্যবহার বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কেন হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবাহিত হয়।
তাই এই পথের যেকোনো ধরনের বাধা বা সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
কিছু দেশ বিকল্প পথে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে, আবার কেউ কেউ উৎপাদনই কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এলএনজি ও কৃষি-শিল্পের যোগসূত্র
এলএনজি শুধু জ্বালানি নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কাঁচামালও। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বিভিন্ন উপ-পণ্য তৈরি হয়, যার মধ্যে সার উৎপাদনের উপাদান অন্যতম।
বিশ্বে ব্যবহৃত ইউরিয়ার বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা মূলত গ্যাস নির্ভর। ফলে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সার উৎপাদন কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদনে।
এছাড়া গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় হিলিয়ামসহ বিভিন্ন উপ-পণ্য পাওয়া যায়, যা চিকিৎসা ও প্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রে হিলিয়াম অপরিহার্য।
কোন দেশগুলো এলএনজি সরবরাহ করে?
বর্তমানে কয়েকটি দেশ বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কাতার, রাশিয়া ও মালয়েশিয়া—এই পাঁচ দেশ মিলেই বিশ্বের অধিকাংশ এলএনজি রপ্তানি করে।
অন্যদিকে আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও তাইওয়ান। এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি এলএনজির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও এলএনজি আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা বেশি হওয়ায় এই নির্ভরতা আরও স্পষ্ট।
সরবরাহ বন্ধ হলে কী হতে পারে?
এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক হয়। প্রথমত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যায়।
এর পাশাপাশি সার উৎপাদন কমে গেলে কৃষি খাতেও সংকট তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামে প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য—দুই খাতেই চাপ বাড়ছে।
কেন এখন এলএনজি নিয়ে এত উদ্বেগ?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় অনেক দেশ বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
কিছু দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি সংরক্ষণ, সরবরাহ সীমিতকরণ কিংবা কাজের সময় কমানোর মতো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এলএনজি এখন শুধু একটি জ্বালানি নয়—এটি বিশ্ব অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিল্প উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

