মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের এক মাস পার হতে না হতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বড় বাস্তবতা—ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় যেগুলোকে অপ্রতিরোধ্য প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেগুলোর অনেকই আংশিক বা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একাধিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অনেক সেনা এখন আশপাশের হোটেল কিংবা বেসামরিক ভবনে অবস্থান করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে শুধু সেনাদের নিরাপত্তাই নয়, স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শুক্রবার নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী। তারা মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের কাছাকাছি এলাকা থেকে বেসামরিক মানুষকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে, যা আসন্ন আরও হামলার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই হামলাগুলোর ব্যাপকতা। ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্জের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অন্তত ১০৪টি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। এই সংখ্যাই প্রমাণ করে সংঘাত কতটা বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটিগুলো। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত অন্তত ১৩টি ঘাঁটি বারবার হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটিতে সর্বোচ্চ ২৩টি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। একই দেশে ক্যাম্প আরিফজানে ১৭ বার এবং ক্যাম্প বুহরিংয়ে ৬ বার হামলা হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এসব হামলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট সরঞ্জাম, জ্বালানি মজুদ এবং গুদামঘর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সরাসরি আঘাতের মুখে পড়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাব বলছে, কুয়েতে গত এক মাসে প্রায় ৫০ বার হামলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৭ বার, বাহরাইনে ১৬ বার, ইরাকে ৭ বার, কাতার ও সৌদি আরবে ৬ বার করে এবং জর্ডানে ২ বার হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এই হামলাগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধের শুরুতেই অন্তত ৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। জর্ডানে হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন থাড ও রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে একটি হ্যাঙ্গার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে একাধিক অ্যান্টেনা ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটিতে বিস্ফোরণে সেনাদের আবাসিক ভবনে বড় ধরনের গর্ত তৈরি হয়েছে, যা হামলার তীব্রতা স্পষ্ট করে। ইরান দাবি করেছে, এসব হামলায় তারা উন্নত খোররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হামলার কৌশলও লক্ষ্য করার মতো। তারা সরাসরি রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে টার্গেট করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে থাড সিস্টেমের চারটি স্থানে আঘাত হানা হয়েছে, যার ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এক মাসের যুদ্ধেই থাডের মজুদ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মাত্র ২৩ দিনের মধ্যেই এই মজুদ শেষ হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, নৌবাহিনীর এজিস সিস্টেমের মজুদ ১৭ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ১৬ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মধ্যে এটিএসিএমএস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ৪৬ শতাংশ মজুদ শেষ হয়ে গেছে, যা যুদ্ধের তীব্রতা বোঝায়। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রায় ১৭ শতাংশ মজুদ কমেছে।
এছাড়া অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদও দ্রুত কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন চরম চাপে রয়েছে। অনেক ঘাঁটি আংশিক বা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে, আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আগের মতো শক্তিশালী নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়ে ইরানের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ইরানে ১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং নৌ অবকাঠামোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ধ্বংস বা অকার্যকর করা হয়েছে।
তারপরও বাস্তবতা হলো—এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ওপর।

