গত এক মাস ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভাবনীয় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে। তারপরও, ইরান তার ‘অসম’ ও বিদ্রোহী কৌশলের মাধ্যমে টিকে রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর অবরোধের কারণে ইরান কার্যত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করেছে। এর ফলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে, কোনো স্পষ্ট বিজয় বা কার্যকর সমাধান না থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।

চার সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
প্রথম সপ্তাহ:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি, বিপ্লবী গার্ড কর্পসের শীর্ষ কমান্ডার এবং একাধিক জেনারেল নিহত হন। জবাবে ইরান শত শত মিসাইল ও ড্রোন ছোড়ে এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে। হিজবুল্লাহও যুদ্ধে যোগ দেয় এবং ইসরায়েলে স্থল অভিযান শুরু করে।
দ্বিতীয় সপ্তাহ:
নিহত নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এই সপ্তাহে প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
তৃতীয় সপ্তাহ:
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে। ইরান কাতারের এলএনজি ফ্যাসিলিটি এবং ইসরায়েলের তেল শোধনাগারে হামলা চালায়। পাশাপাশি, ইরানের দুটি ভারী মিসাইল ইসরায়েলের দিমোনা ও আরাদ শহরের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে আঘাত হানে।
চতুর্থ সপ্তাহ:
পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাঠায়, কিন্তু ইরান তা ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খোলার আল্টিমেটাম কয়েক দফায় পিছিয়ে দেন। এ সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও ইস্পাত কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সামরিক ও কৌশলগত দৃশ্য
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল আকাশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নৌবাহিনী ধ্বংসের ওপর নির্ভর করে। তবে এই অভিযান ব্যয়ভার বিশাল – মাত্র ১৬ দিনে ১১,২৯৪টি মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার।
ইরান প্রথাগত যুদ্ধে না জড়িয়ে ‘শুট অ্যান্ড স্কুট’ বা ছায়াযুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে। পাহাড় ঘেরা ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির সুবিধা নিয়ে তারা সস্তা কামিকাজি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ এবং বার্ষিক ১,৫০০ মিসাইল ও ২,০০০ ড্রোন উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে।

মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এই সংঘাতের ফলে মানুষের প্রাণহানি ব্যাপক। ইরানে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার, যার মধ্যে মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৭০-এর বেশি নারী ও শিশু নিহত। লেবাননে ১,১১৬ জন নিহত এবং ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এই ঘটনাকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
অর্থনীতিতেও প্রভাব গভীর। হরমুজ প্রণালীর অবরোধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। কাতারের এলএনজি টার্মিনালে হামলায় তাদের ১৭% রপ্তানি ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে, যা বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম গ্যালন প্রতি প্রায় ৪ ডলার পৌঁছেছে, এবং বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে দরপতন ঘটেছে।

রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে। ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানো নিয়ে দেশ ও মিত্রদের মধ্যে তীব্র আপত্তি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো সতর্ক। কাতার, সৌদি আরব ও ইরাক যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় হুমকির মুখে পড়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে হারাতে পারবে না। তাদের লক্ষ্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে টিকে থাকা এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, যা তাদের জন্য চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

