মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এর সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক জটিল মোড় নিয়েছে। যুদ্ধকে সামরিক কৌশল, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বা পারমাণবিক ঝুঁকি দিয়ে বিচার করা হলেও, এর গভীরে রয়েছে শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের এক শক্তিশালী আখ্যান।
নর্থ-ইস্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের দর্শনের সহকারী অধ্যাপক হোসেইন দাব্বাগ বলেছেন, বাহ্যিক এই চরম আঘাত ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংহতিকে আরও দৃঢ় করছে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল আমলাতান্ত্রিক নয়; এটি একটি নৈতিক প্রকল্প, যা ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইতিহাসের কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগ শিয়া চেতনায় অমলিন। বর্তমান যুদ্ধকেও তেহরান সেই ‘ন্যায় বনাম অন্যায়ের’ লড়াই হিসেবে তুলে ধরছে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর রাতভর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান এবং বাসিজ বাহিনীর মতো আধাসামরিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আমৃত্যু লড়াইয়ের শপথ প্রমাণ করে, এই যুদ্ধ এখন কেবল অস্ত্রের লড়াই নয়; এটি আদর্শিক টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো আশা করেছিল প্রবল সামরিক চাপ ইরানকে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বৈদেশিক আক্রমণ ইরানিদের মধ্যে ‘অবরুদ্ধ মানসিকতা’ তৈরি করেছে। সাধারণ জনগণের ক্ষোভ অভ্যন্তরীণ অপশাসনের দিকে না গিয়ে, বহিরাগত শত্রুর দিকে ঘুরে যাচ্ছে। এমনকি যারা সরকারকে সমালোচনা করত, তারা এখন জাতীয়তাবাদ ও সম্মিলিত শাস্তির ভয়ে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে।
ফলে, ইরান দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে। লক্ষ্য হলো, নিজেদের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও শত্রুর রাজনৈতিক ধৈর্য পরীক্ষা করা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণের’ দাবি এই সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। এটি ইরানকে এমন একটি শত্রুর ছবি আঁকতে সাহায্য করছে, যা তাদের চিরাচরিত ‘সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে’ আখ্যানকে বৈধতা দেয়।
সেনা ও অবকাঠামো হারালেও, রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে ইরান ‘শাহাদাত’-এর নতুন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। বাইরে থেকে যত বেশি আঘাত করা হচ্ছে, ভিতরের সেই আদর্শিক ভিত্তি তত বেশি দৃঢ় হচ্ছে। এই যুদ্ধ ইরানের বস্তুগত ভিত্তি দুর্বল করতে পারে, তবে তার আদর্শিক টিকে থাকার গল্পকে দীর্ঘজীবী করে তুলতে সক্ষম।

