ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য যে শর্তগুলো দিয়েছেন, তার মধ্যে একটা নতুন দাবি ছিল। আগে কখনো এটা ছিল না। দাবিটি হলো: হরমুজ প্রণালীর উপর ইরানের সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
এই সরু জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) যায়। এখন এটাই হয়ে উঠেছে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আর ইরান চাইছে এই অস্ত্রকে শুধু যুদ্ধের সময় ব্যবহার না করে, প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয়ের উৎস বানাতে।
ইরান আগেও বলতো, যদি তাদের উপর হামলা হয় তাহলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। কিন্তু অনেকেই ভাবেনি যে তারা সত্যি সত্যি এটা করবে, কিংবা এতটা কার্যকর হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, ইরানের এই কৌশল খুবই সফল হয়েছে। বিশ্বের তেলের বাজার একদম তোলপাড় হয়ে গেছে। অনেক দেশ জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, “ইরান নিজেই হয়তো একটু অবাক হয়ে গেছে যে, এত সস্তায় এবং এত সহজে তারা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলতে পেরেছে। যুদ্ধ থেকে তারা একটা বড় শিক্ষা পেয়েছে – এটা তাদের নতুন শক্তি। ভবিষ্যতেও তারা এই শক্তি ব্যবহার করবে। আর এই শক্তিকে টাকায় পরিণত করা (মানি মেকিং) তাদের নতুন পরিকল্পনার অংশ।”
আমেরিকা এই ঝুঁকি খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ইরানের হরমুজ প্রণালীতে টোল (পথকর) আদায়ের চেষ্টা।
তিনি বলেন, “এটা একদম অবৈধ, অগ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক। সারা বিশ্বের এর বিরুদ্ধে একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার।”
জি-৭ দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, “হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ ও টোল-মুক্ত নৌচলাচল নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি।”
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর প্রথম ভাষণে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার এই শক্তিকে ভবিষ্যতেও ব্যবহার করতে হবে।
আগের সব আলোচনায় ইরান শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির অধিকার চেয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কখনো দাবি করেনি। এখন তারা এই নতুন দাবি যোগ করেছে।
ইরানের পার্লামেন্টে এখন একটা বিল নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে বলা হচ্ছে – যেসব দেশ হরমুজ দিয়ে তেল বা পণ্য পরিবহন করবে, তাদের টোল দিতে হবে। সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা বলেছেন, যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালীর জন্য “নতুন নিয়ম” চালু করা হবে। এই নিয়মে ইরান চাইলে তার শত্রু দেশগুলোকে প্রণালী ব্যবহার করতে বাধা দিতে পারবে। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথের প্রবেশাধিকার এখন ইরানের রাজনৈতিক ইচ্ছার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে এই টোল ব্যবস্থা স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হবে। কিন্তু যদি কোনোভাবে তা সম্ভব হয়, তাহলে আয় হতে পারে মিশরের সুয়েজ খালের সমান।
প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ দিয়ে যায়। যদি প্রতি বড় ট্যাঙ্কারের জন্য ২০ লাখ ডলার টোল ধার্য করা হয়, তাহলে শুধু তেল থেকেই প্রতিদিন ২ কোটি ডলার, মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার আয় হতে পারে।
এলএনজি যোগ করলে মাসে ৮০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় হওয়ার সম্ভাবনা। এটা ২০২৪ সালে ইরানের মাসিক তেল রপ্তানি আয়ের ১৫-২০ শতাংশের সমান।
তুলনায় মিশর সাধারণত সুয়েজ খাল থেকে মাসে ৭০-৮০ কোটি ডলার আয় করে।
ইরানের অর্থনীতি এখন খুব চাপে আছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা অনেক ক্ষতির মুখে। তাই এই টোল ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটা সহজ উপায় হিসেবে দেখছে।
ইরান বারবার বলছে, হরমুজ প্রণালী খোলা আছে – তবে শর্তসাপেক্ষে। তারা বলছে, “শত্রুতাপূর্ণ নয়” এমন জাহাজগুলো যেতে পারবে, তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
ইতিমধ্যে কিছু জাহাজ ইরানের কাছাকাছি দিয়ে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ নিরাপদে যাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছে বলে খবর আছে। লয়েড’স লিস্ট জানিয়েছে, অন্তত দুটি জাহাজ ২০ লাখ ডলার করে দিয়েছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড একটা নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করেছে অনুমোদিত জাহাজের জন্য।
লয়েড’স লিস্টের সম্পাদক রিচার্ড মিড বলেন, “এটা এখনই ঘটছে। যদি আলোচনায় অগ্রগতি না হয়, তাহলে এটা আরও বাড়বে। বর্তমানে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।

