প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ২১ বছর। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছয় বছর পর শেষ হয়। বিজয়ী মিত্রশক্তির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে পরাশক্তি, আর রাশিয়া ভেঙে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী ৮০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ করেছে। যদিও হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে পরাজয়ের মুখও দেখতে হয়েছে।
এবার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত অন্যান্য সব যুদ্ধের তুলনায় আলাদা। প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও, ক্ষয়ক্ষতি, কৌশলগত প্রভাব এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঝুঁকিের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে বৈশ্বিক অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরেছে। তেলের দাম হু-হু করে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেমন ফিলিপাইন জ্বালানি জরুরি অবস্থা জারি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই অর্থ আসে, যা দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাতের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা অবশ্যম্ভাবীভাবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে প্রভাবিত করবে।
যুদ্ধের সমাধান হতে পারে কি না তা আলোচনার টেবিলে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এর একটি পোস্টের স্ক্রিনশট সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন। সেখানে পাকিস্তান জানিয়েছেন, আলোচনার আয়োজন করতে তারা প্রস্তুত।
শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এর সঙ্গে এক ঘণ্টার বেশি কথা বলেছেন। পেজেশকিয়ান বলেছেন, আলোচনাকে এগিয়ে নিতে দু’পক্ষের মধ্যে আস্থা অর্জন জরুরি।
‘আস্থা’ কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চলাকালীন আলোচনার মাঝেই ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। জেনেভায় ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, কিন্তু হামলা পরিস্থিতিকে অচল করে দেয়।
ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ও হামলা না করার নিশ্চয়তা চাইছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরান পরমাণু সমৃদ্ধকরণ বাদ দেবে, ক্ষেপণাস্ত্র বানাবে না এবং প্রক্সি সহায়তা বন্ধ করবে।
দু’পক্ষই অনঢ় অবস্থানে। চলমান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে হলে উভয় পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে।
যদি লক্ষ্য থাকে শুধু ইরানকে ধ্বংস করে গাজা, সিরিয়া বা লেবাননের মতো বানিয়ে দেওয়া, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলবে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের হারার সম্ভাবনা নেই, তেমনি ইরানেরও নেই।

