সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরে কোনো ইরানি দ্বীপ দখল করতে পাঠানো মার্কিন মেরিন ও প্যারাট্রুপাররা অরক্ষিত সরবরাহ লাইন এবং অস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্যের কারণে এক ধরনের ‘শুটিং গ্যালারি’তে নিক্ষিপ্ত হতে পারেন।
একটি মার্কিন আক্রমণ শুরু হতে পারে এলাকাটির ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও রাডার জ্যাম করার মাধ্যমে, যার পরপরই চালানো হবে তীব্র বোমা হামলা।
“যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে প্রস্তুতি ও বিচ্ছিন্নকরণের প্রচেষ্টা চালাতে হবে,” মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিশেষ অভিযানের সাবেক চিফ অব স্টাফ সেথ ক্রুমরিচ এমইই-কে বলেন।
ইলেকট্রনিক যুদ্ধের পর “প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য” প্রস্তুতিমূলক হামলা চালানো হবে বলে জানান ক্রুমরিচ, যিনি বর্তমানে বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা গ্লোবাল গার্ডিয়ানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে, তবে প্রধান লক্ষ্য হতে পারে তিনটি।
তালিকার শীর্ষে রয়েছে খার্গ দ্বীপ। এটি কুয়েতের বিপরীতে অবস্থিত এবং এখান থেকেই ইরান তার প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি করে।
আবু মুসা এবং এর সঙ্গে যুক্ত দুটি ছোট দ্বীপ পারস্য উপসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত। ইরানের সাবেক শাহ ১৯৭১ সালে এগুলো দখল করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এগুলোর মালিকানা দাবি করে।
আরেকটি সম্ভাব্য লক্ষ্য কেশম দ্বীপ। এটি দখল করা সবচেয়ে কঠিন হবে, কারণ এটি বৃহত্তম এবং এখানে একটি সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেখানে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করে রাখে।
দ্বীপটিতে প্রায় দেড় লাখ ইরানি বাস করে এবং এটি বন্দর আব্বাস থেকে খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে কেশম ও পার্শ্ববর্তী লারাক দ্বীপের মধ্য দিয়ে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
সমুদ্রপথের চেয়ে আকাশপথে আক্রমণের সম্ভাবনাই বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওকিনাওয়া ও ইও জিমার যুদ্ধ প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে টানা হয়। তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ড্যানিয়েল ডেভিস এমইই-কে বলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকায় প্রাথমিক মার্কিন আক্রমণ সম্ভবত আকাশপথেই হবে।
“আমি মনে করি না ইউএসএস বক্সার বা ইউএসএস ত্রিপোলিকে সহজে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আনা যাবে,” তিনি বলেন।
তার মতে, “বাস্তব সম্ভাবনা একটাই—আকাশপথ।”
মার্কিন বাহিনী ভি-২২ অসপ্রে টিল্ট-রোটার বিমান, চিনুক এবং ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তবুও দেশটি এই অঞ্চলে যুদ্ধ বাহিনী পাঠাচ্ছে।
প্রায় ২,৫০০ সৈন্যের দুটি নৌ-অভিযানকারী ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ৩,০০০ প্যারাট্রুপার মোতায়েন করা হচ্ছে।
মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ইউএস নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক কালেভ সেপ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতের মতো দেশগুলোর ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হবে।
“এই দেশগুলো ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দিলে অভিযান সম্ভব নয়,” তিনি বলেন।
ডেভিস সতর্ক করে বলেন, হেলিকপ্টারে করে নামা মার্কিন সেনারা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, ছোট অস্ত্র ও আরপিজির ঝুঁকিতে থাকবে।
“ইরানও মানচিত্র পড়তে পারে, তাই তারাও প্রস্তুত থাকবে,” তিনি বলেন।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের চেয়েও কঠিন
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধ ছিল সর্বশেষ বড় উদাহরণ, যেখানে একটি পশ্চিমা বাহিনী দ্বীপ পুনর্দখলের চেষ্টা করেছিল। সেই সময় আর্জেন্টিনার বিমান হামলায় ব্রিটিশ জাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন, কারণ দ্বীপগুলো মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে। ফলে স্থল থেকে প্রতিরক্ষা সহজ।
সেপ বলেন, “ফকল্যান্ডের তুলনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ আরও কঠিন হবে, বিশেষ করে ড্রোন যুদ্ধের কারণে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরান প্রথম আক্রমণ ঠেকাতে না পারলেও পরে গেরিলা কৌশলে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
আইআইএসএস-এর রুবেন স্টুয়ার্ট বলেন, “ইরান তার মোজাইক প্রতিরক্ষা কৌশল ব্যবহার করবে।”
এই কৌশলে প্রতিটি প্রদেশভিত্তিক কমান্ড স্বতন্ত্রভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে।
“তারা গেরিলা যুদ্ধ করবে এবং মার্কিন বাহিনীকে উন্মুক্তভাবে চলাচল করতে দেবে না,” তিনি বলেন।
রসদ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ
স্থলে নামার পর মার্কিন বাহিনীকে খাদ্য, জ্বালানি, গোলাবারুদ ও চিকিৎসা সহায়তা দিতে হবে—যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সেপ বলেন, “প্রতি এক জন সৈন্যের জন্য প্রায় নয়জন রসদ সহায়ক প্রয়োজন হয়।”
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ইরানি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় ১৩টি আঞ্চলিক ঘাঁটির বেশিরভাগই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ডেভিস বলেন, “এই বাহিনী দ্রুত গতিশীল হলেও স্থির হয়ে গেলে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।”
“এটা একটা শুটিং গ্যালারি হয়ে যাবে,” তিনি মন্তব্য করেন।
স্টুয়ার্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘অপারেশন মার্কেট গার্ডেন’-এর ব্যর্থতার উদাহরণ দেন, যেখানে প্যারাট্রুপাররা অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল।
ইরানের পাল্টা কৌশল
ইরানও পাল্টা আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিরা সংঘাতে যুক্ত হলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে।
ক্রুমরিচ বলেন, খার্গ দ্বীপ দখল করা হলে তা মূলত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেশম বা আবু মুসার মতো দ্বীপ দখল করলে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন কৌশলগত সুবিধা হবে না।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ঘাঁটি থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে সুবিধা ইতিমধ্যেই রয়েছে, এসব দ্বীপ দখল তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে না।
সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

