ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে এবং লেবাননের লক্ষ লক্ষ বেসামরিক নাগরিক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, যারা এখন দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাদের দেশের ওপর দ্বিতীয় বড় আকারের ইসরায়েলি আক্রমণের সম্মুখীন।
ইসরায়েলের জারি করা গণহারে জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের পর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর, যা দাহিয়েহ নামে পরিচিত, সেখান থেকে দেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বাস্তুচ্যুতদের অনেকেই চরম হতাশ ও ক্লান্ত। আর যারা বাস্তুচ্যুত হননি, তারাও চাপ অনুভব করছেন; কারণ ইসরায়েলি প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রয়েছে, পেট্রোলের দাম বাড়ছে, সার্বিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য মন্থর হয়ে পড়েছে এবং এই সংঘাত শিগগিরই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সামিহা, একজন ফিলিস্তিনি শিক্ষিকা যিনি দক্ষিণ লেবাননের টায়ারের কাছে থাকতেন কিন্তু সম্প্রতি বৈরুতে চলে গেছেন, বলেছেন যে অভিজ্ঞতাটি “একেবারেই ভালো ছিল না”। তবে কিছুদিন আগে লেবাননে হওয়া আগের ইসরায়েলি অভিযানের কারণে তার পরিবার এবার আরও বেশি প্রস্তুত হয়ে এসেছিল।
“এটা আমাদের জন্য প্রথমবার নয়। এখন আমরা জানি কোথায় যেতে হবে।” তবুও, তিনি বললেন, “আমরা জানি না এটা কতদিন চলবে এবং এর কোনো সমাধান আছে কি না।”
বিদেশিরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি হামলার জবাব দেওয়ায় হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২ মার্চ ইসরায়েল লেবাননের ওপর যুদ্ধ পুনরায় তীব্র করেছে।
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, দুই দিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। জাতিসংঘ ঐ সময়ে ১০,০০০-এরও বেশি ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং শত শত লেবানিজের মৃত্যুর হিসাব দিলেও- ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ২৭ নভেম্বর, ২০২৪ থেকে একটি যুদ্ধবিরতি দৃশ্যত কার্যকর ছিল।
বিজ্ঞাপন
হিজবুল্লাহর জবাবের পর, ইসরায়েল দক্ষিণে তার হামলা আরও তীব্র করেছে এবং দক্ষিণ লেবানন দখল করার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে। লেবানন সরকারের মতে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকা, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি এবং পূর্ব বেকা উপত্যকার কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার আদেশও জারি করেছে, যার ফলে কমপক্ষে ১২ লাখ মানুষের এক বিশাল বাস্তুচ্যুতি সংকট তৈরি হয়েছে। এখন ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন দখল করে একটি তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর আরও গ্রাম ধ্বংস করার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছে।
এই সংকট লেবাননের অধিবাসীদের, বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীকে মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে।
“আমরা যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিগুলোর সম্মুখীন হচ্ছি, সেগুলো মূলত অভিবাসী শ্রমিক, সিরীয় বা বিদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ,” বৈরুতের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা বিয়েলের কাছে ত্রাণ আয়োজনকারী স্বেচ্ছাসেবক রেনা আইয়ুবি সূত্র সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন।
তিনি বলেন, এই সময়ে আরো যারা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, ডায়ালাইসিসরত ক্যান্সার রোগী, যারা ইনসুলিন পান না এবং বাস্তুচ্যুত মানুষ যাদের ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ নেই।
‘আকার ও গতিতে ভিন্ন’
সাহায্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং জাতিসংঘ কর্মীসহ বিভিন্ন সূত্রের মতে, একের পর এক বিপর্যয় ঘটছে, যাতে নারী, শিশু এবং মানসিক সমস্যায় জর্জরিতরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা বলেছেন, ২০২৪ সালের মানবিক সংকট গুরুতর ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের সংকট সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।
জাতিসংঘের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সংস্থা (ইউএনএফপিএ)-এর লেবানন প্রতিনিধি আনন্দিতা ফিলিপোস সূত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “ব্যাপকতা, গতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে এখন পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। গণহারে সরে যাওয়ার আদেশ নতুন। বাস্তুচ্যুতির মাত্রা নতুন। বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, এটাও নতুন।”
বিশেষ করে অনেক নারী শুধু তাদের বাড়ি থেকেই নয়, বরং তাদের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক থেকেও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন; যার মধ্যে রয়েছে সেইসব কার্যালয় বা সহায়তা ব্যবস্থা যা তাদের গর্ভাবস্থায় সাহায্য করবে।
“সংঘাতের মাঝে গর্ভবতী নারীরা সন্তান প্রসব করা বন্ধ করেন না এবং সংঘাতের মাঝে নারীদের মাসিকও বন্ধ হয়ে যায় না,” ফিলিপোস বলেছেন।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ওপর ইসরায়েলের সর্বশেষ যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১,০৯৪ জন নিহত এবং আরও ৩,১১৯ জন আহত হয়েছেন। মাত্র তিন সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে নিহতদের মধ্যে ৮১ জন নারী ও ১২১ জন শিশু রয়েছে।
লেবাননে ওয়ার্ল্ড ভিশনের জাতীয় পরিচালক হাইডি ডিড্রিক সূত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এই উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে শিশুরা আবারও আটকা পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে বেসামরিক নাগরিক হিসেবে সুরক্ষিত মর্যাদা এবং শিশু হিসেবে তাদের অধিকার থাকা সত্ত্বেও- এই সহিংসতায় তারা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে এই উত্তেজনা বৃদ্ধি আগামী সপ্তাহ বা এমনকি মাস ধরেও লেবাননের শিশুদের প্রভাবিত করতে থাকবে।”
অন্তহীন মানসিক আঘাত
বৈরুতের একটি অফিস ভবনে, দুজন স্বেচ্ছাসেবক ডেস্কের পেছনে বসে ফোনের অপেক্ষায় আছেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা এই স্বেচ্ছাসেবকদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ফোনের অপর প্রান্তে সাহায্যের জন্য ফোন করছেন এমন সব মানুষ, যাদের অনেকেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন।
এটি লেবাননের জাতীয় লাইফলাইন (১৫৬৪)-এর অফিস নম্বর। এটি মানসিক সহায়তা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য একটি হটলাইন, যা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা একটি অলাভজনক সংস্থা ‘এমব্রেস’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।
“আমরা গত দুই বছর ধরে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছি,” বৈরুতের লাইফলাইন কেন্দ্র থেকে সূত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন ন্যাশনাল লাইফলাইন ১৫৬৪-এর অপারেশনস ম্যানেজার জাদ চামুন।
যুদ্ধবিরতি থাকলেও মানুষ তখনও সেই পরিস্থিতিতেই বাস করছিল, তারা তখনও বাস্তুচ্যুত ছিল।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, ২ মার্চের আগেও লেবাননে প্রায় ৬৪,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। লেবাননের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির মার্চ ২০২৫-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজন “বর্তমানে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা পিটিএসডি-তে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন।” আর এই পরিস্থিতি ছিল বর্তমান তীব্রতা বৃদ্ধির আগের।
“আমরা যে জীবনযাত্রায় আছি তা এক অবিরাম মানসিক যন্ত্রণা, কারণ এর কোনো শেষ নেই” চামুন বলেন। লেবানন ২০১৯ সালে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল, যা আজও চলছে। পরবর্তী বছরগুলোতে লেবাননের মানুষ কোভিড-১৯ মহামারি, বৈরুত বিস্ফোরণ, গণ অভিবাসন এবং এখন অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি ইসরায়েলি বৃহৎ সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে।
চামুন বলেন, বর্তমান সহিংসতার মধ্যে কলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; ২০২৪ সালের ইসরায়েলি হামলার সময় যেখানে দিনে প্রায় ৩০টি কল আসত, এখন তা বেড়ে প্রায় ৫০টিতে দাঁড়িয়েছে।
তবে তিনি আরো বলেন, কোনো সংঘাত বা সংকট শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরেই সাধারণত কলের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বর্তমানে মানুষ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
একের পর এক বিপর্যয় এবং নৃশংস ইসরায়েলি আগ্রাসন লেবাননের অনেককে তাদের সহ্যসীমার কাছাকাছি বা তা অতিক্রম করে ফেলেছে। অনেকেই সাহায্যের হাত থেকে ছিটকে পড়ছে। এই ধরনের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবক এবং পেশাদাররা যত বেশি সম্ভব মানুষকে সাহায্য করার জন্য নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।
“আমাদের চারপাশের এই ভারী অন্ধকারে আমরা তাদের পাশে বসার চেষ্টা করি। আমরা তাদের সঙ্গে এই যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করি,” চামুন বলেন। “আর আজকাল এটাই সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠেছে।”
সূত্র: ‘আল-জাজিরা’র ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

