ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বর্তমানে ইরানের পররাষ্ট্র নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। চলমান যুদ্ধের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালানোর দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে তাকে। এই পরিস্থিতিতে, ইরান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার প্রভাব আরো বেড়েছে। কিন্তু কে এই গালিবাফ, এবং কীভাবে তিনি এতদূর এসে পৌঁছেছেন? চলুন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
গালিবাফের শুরুর দিক এবং রাজনৈতিক উত্থান
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জন্মগ্রহণ করেন ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোরঘাবেহর, একটি ধর্মপ্রাণ শ্রমিক পরিবারে। তার শৈশবের শুরু মাশহাদের কাছে, যেখানে তিনি ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম নেতাদের শরণাপন্ন হন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, তিনি মাশহাদের প্রধান মসজিদে বিপ্লবী আলেমদের ক্লাসে অংশগ্রহণ শুরু করেন। এরপর ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর, গালিবাফ ইরাক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন এবং ২০ বছর বয়সে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এ যোগ দেন।
১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত গালিবাফ আইআরজিসির কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তার রাজনৈতিক ও সামরিক ক্যারিয়ার আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালের আন্দোলনেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল, যা ইরানের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
পুলিশ প্রধান থেকে তেহরানের মেয়র
গালিবাফের ক্ষমতা বৃদ্ধির কাহিনী এখানেই শেষ হয়নি। ছাত্র আন্দোলন ও আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তিনি ২০০৫ সালে ইরানের পুলিশ প্রধান পদে নিযুক্ত হন। সেখানে তার প্রধান কাজ ছিল জরুরি পুলিশ হটলাইন তৈরি করা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া সহজতর করা। তবে তার বেশিরভাগ অর্জন ছিল ব্যয়বহুল, যেমন বিদেশি যানবাহন দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে সজ্জিত করা।
এছাড়া, গালিবাফ ২০০৫ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও পরাজিত হন এবং এরপর তেহরানের সিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে মেয়র পদে নিযুক্ত হন। তেহরানে তার মেয়র হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছরের পদক্ষেপে তিনি মেট্রো সিস্টেমের উন্নয়ন এবং পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকীকরণের জন্য ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলেন।
কেলেঙ্কারি এবং সমালোচনার মুখে
গালিবাফের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অবশ্য একসময় কিছু কেলেঙ্কারির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০১৬ সালে ‘বিপুল মূল্যের সম্পত্তি’ কেলেঙ্কারির কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় সিটি কাউন্সিলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের সম্পত্তি বিক্রি করার অভিযোগ তোলা হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় ধরনের ধাক্কা ছিল। এছাড়া, ২০১৭ সালের প্লাস্কো ভবন আগুনের ঘটনা, যা তার নেতৃত্বাধীন নগর সরকারের পদ্ধতিগত অবহেলাকে প্রকাশ করে, তাকে সমালোচনার সম্মুখীন করেছিল। তবে, এই কেলেঙ্কারির পরও গালিবাফকে বরখাস্ত বা অভিশংসন করা হয়নি, এবং তিনি রাজনৈতিক রেহাই পেয়েছেন।
মার্কিন-ইরান সম্পর্ক এবং গালিবাফের ভূমিকা
বর্তমানে, গালিবাফের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে, তার ভূমিকা অনেকটা ফোকাসে চলে এসেছে। সম্প্রতি, ইরানের সরকারের পক্ষ থেকে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে, পাকিস্তান সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, গালিবাফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উভয়কেই ইসরায়েলের ‘হিট লিস্ট’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা তার নিরাপত্তার দিক থেকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া, গালিবাফ তার কঠোর এবং বাস্তববাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত। তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং কট্টরপন্থী চিন্তা-চেতনার কারণে তিনি ইরানের শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্রগুলির মধ্যে এক অন্যতম। তবে, গালিবাফের প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মিশ্রিত—কিছু কর্মকর্তা তাকে কাজ চালানোযোগ্য এক অংশীদার হিসেবে দেখেন, আবার কিছু বিশেষজ্ঞ তাকে পুরোপুরি বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করেন।
গালিবাফের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার প্রভাব
বর্তমানে, গালিবাফের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ইরান ও আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন-ইরান সম্পর্কের উন্নতি অথবা অবনতি—যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তার নেতৃত্বে ইরান কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করবে, তা ভবিষ্যতে অনেকটাই নির্ভর করবে।
তবে, গালিবাফের নিজস্ব মতামত ও অবস্থান কোনোভাবেই নির্ধারণযোগ্য নয়। তার কঠোরতা এবং রাজনৈতিক বাস্তববাদিতা ইরানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, অথবা বিশ্ব রাজনীতিতে তার ভূমিকা বড় ধরনের সংকটে পরিণত হতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—গালিবাফ, যিনি শত্রুদের সতর্ক করার জন্য ‘ভূমি রক্ষার সংকল্পকে’ পরীক্ষা না করার আহ্বান জানিয়েছেন, তিনি কি ইরানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন?

